Blog

গতকাল সকালে টোকিও এসেছি। জাপানে আমি এবারই প্রথম। ছোটবেলা থেকে জাপানি প্রোডাক্টের গুণগত মান ভালো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকা তাদের শত্রু হিটলারের বন্ধু জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল, জাপান বাংলাদেশের নিঃস্বার্থ ডেভেলপমেন্ট পার্টনার আর জাপানি মানুষজন খুবই বিনয়ী ও ডিসিপ্লিন্ড – এগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়েছি।

 

গতকাল সকালে নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশনে কর্মরত মানুষগুলোর আচরণ থেকেই তা প্রথম অনুভব করতে শুরু করলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে নারিতা থেকে স্কাইলাইন ট্রেনে টোকিও সিটিতে আসছিলাম। সেসময় কিছুক্ষণ পরপর পুলিশ/চেকার আসছিল বিভিন্ন কম্পার্টমেন্টে। কিন্তু তাদের এক কম্পার্টমেন্ট থেকে আরেকটি কম্পার্টমেন্টে মুভ করার সময় একেকটি কম্পার্টমেন্টের দরজা অটোমেটিক্যালি খুলে যাবার পর যখন পুলিশের চেহারা দৃশ্যমান হচ্ছিল তখন প্রথমেই সে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকিয়ে নত করে (ওরা বোধহয় এটাকে ‘বো’ বলে) হাসিমুখে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিল যার মানে দাঁড়ায় যে, সে প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে সম্মানিত যাত্রীদের তথা জনসাধারণের সেবায় নিয়োজিত; কেউ যেন তার আচরণে কোনো বেয়াদবি বা বিরক্তি অনুভব না করে।

 

টোকিও আসার পর যে কোনো দোকানে বা সুপারশপে বা রেস্টুরেন্টে গেলেই প্রথমে স্বাগত জানানোর সময় এবং পরে বিদায় দেওয়ার সময় কী কী যেন হাসিমুখে বিনয়ের সাথে বলতে থাকে জাপানি ভাষায় ওরা। আমিও না বুঝে হাসিমুখে বোবার মতো ওদের দিকে তাকিয়ে বন্ধুসুলভ অভিব্যক্তি দিলাম অনেক জায়গায়।

 

আজকে দুপুরের দিকে আমার হোটেলের নিকটবর্তী স্টেশন থেকে ইয়োকোহামা যাব। টিকিট কাউন্টারে দায়িত্বরত অত্যন্ত বিনয়ী, বন্ধুবৎসল ও স্মার্ট তরুণীকে বলার পরে বেচারির বিন্দুমাত্রও ইংরেজি না জানা থাকাতে আমাদের বাতচিৎ শেষ হতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগল; কারণ, বেশ কয়েকটি অপশন ছিল ট্রেনের ধরন ও ট্রান্সফার সংক্রান্ত। শেষ পর্যন্ত সে আমাকে মেশিনে গিয়ে সহযোগিতা করে ৬৬০ ইয়েনের ওয়ানওয়ে টিকিট বের করে বুঝিয়ে দিল কীভাবে যেতে হবে তাদের ভাষায় যা আমার কাছে এলিয়েনদের ভাষার মতো।

 

আমি আমার স্টেশন থেকে প্রথমে গিয়ে নামলাম টোকিও স্টেশনে। মহাসমুদ্রের মতো টোকিও স্টেশনে গিয়ে কুলকিনারা হারিয়ে ফেললাম। শেষমেশ ইনফরমেশন থেকে গাইডলাইন নিয়ে এক বা দুই তলা ওপরে গিয়ে একটা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি। মনে করলাম, পাশে দাঁড়ানো মানুষটাকে জিজ্ঞেস করি। অনেক অনেক কষ্টে ব্যাকরণ ও বাক্যছাড়া কেবল ‘ইয়োকোহামা স্টেশন’ নামক শব্দবোমা বারবার নিক্ষেপ করে তার দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হলাম।

 

সে বলল যে, এই লাইনে এখন যে ট্রেন আসবে সেটাতে উঠলে আমাকে আবার ট্রান্সফার করতে হবে কোথায় যেন গিয়ে, আর ডাইরেক্ট ট্রেন পাইতে হলে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। শুনে আমি ভড়কে গেলে কী যেন মনে করে উনি আরেকটু সামনে গিয়ে আমাকে একটা লাইনে দাঁড়াতে বললেন যেখানে ১২/১৩ মিনিটের মধ্যেই ইয়োকোহামার ডাইরেক্ট ট্রেন আসবে। আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং সেই লাইনে দাঁড়ানো একজনকে আগের মতোই কেবল ‘ইয়োকোহামা স্টেশন’ নামক শব্দবোমা নিক্ষেপ করে জানতে চাইলে সে আশ্বস্ত করে বলল যে, ওই লাইনে কিছুক্ষণের মধ্যেই যে ট্রেন আসবে তা ডাইরেক্ট ইয়োকোহামা যাবে। জানে পানি পেলাম। যথাসময়ে ট্রেন আসল।

 

ট্রেনে উঠে দেখি দোতলা ট্রেন; আমি ওপরের তলায় গিয়ে চেয়ারকোচের মতো সুন্দর একটা আসনে বসে পড়লাম, মনে মনে বেজায় খুশি, ‘পাইলাম, আমি শেষ পর্যন্ত ইহাকে পাইলাম!’।

 

জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনের আনন্দে যাচ্ছি। হঠাৎ পাশে এসে সদ্য যৌবনছোঁয়া এক অসহ্য রকমের সুন্দরী রমণী আমাকে কী যেন বলার চেষ্টা করছে! ভাবছি, কী ব্যাপার, আমি কি তার আসনে বসে পড়েছি ভুল করে? কিছুক্ষণ বাদে আমার টিকিট দেখতে চাওয়ার পরে বুঝতে পারলাম, সে আসলে ওই ট্রেনের চেকার মহোদয়া। কিন্তু বেচারি একটু বেশি কমবয়সী সুন্দরী তরুণী হওয়ার কারণে চেকার চরিত্রে তাকে বেমানান ঠেকছিল। টিকিট দেখাতেই সে বলল যে, ওটা এই ট্রেনের টিকিট না; ওটা লোকাল ননরিজার্ভড সিটের এমআরটি ট্রেনের টিকিট। আর আমি উঠে বসেছি রিজার্ভড সিটের কমপার্টমেন্ট-সম্বলিত ট্রেনে। বলে রাখি, কথা হচ্ছিল তার মোবাইলে সেইভ করে রাখা ল্যাংগুয়েজ কনভার্টার অ্যাপের মাধ্যমে যেটা জাপানে অধিকাংশ জায়গাতেই আমাকে করতে হয়েছে।

 

আমি বললাম, তাহলে আমি আমার টিকিটের সাথে মিল রেখে তেমন কোনো কমপার্টমেন্টের সিটে গিয়ে বসি। তরুণী বলল যে, সেটার আর সুযোগ নাই; কারণ, এটা স্পেশাল ট্রেন যেখানে ওই মানের কোনো কম্পার্টমেন্ট নাই। আমি বললাম, তাহলে উপায়? সে বলল যে, এই ট্রেনের সিটের মূল্য পরিশোধ করে তার কাছ থেকে টিকিট নিতে হবে যার দাম ১০৪০ ইয়েন। আমি ক্রেডিট কার্ড বের করতেই বলল, ক্যাশ দিতে হবে; ভাগ্যিস ক্যাশ ছিল আমার কাছে।

 

তরুণী চলে যাবার পরে নিজেকে কিছুটা বেকুব মনে করে কিছুক্ষণ আত্মগ্লানিতে ভুগলেও পরে মনকে সান্ত¡না দিয়ে বললাম, ‘ছিলাম বেকুব, হইলাম বুদ্ধিমান; জীবনে আর কোনোদিন এই ভুল করছি না’। এটাও তো জীবনের একটা শিক্ষা। জীবনের কোনো শিক্ষাই মূল্যহীন না।

 

তখন মনে পড়ে গেল এমবিএ করার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ইনস্টিটিউটের ড. মফিজুর রহমান স্যারের ইকোনমিক্স ক্লাসের কথা। আমি যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করতাম, উনি সেখানেও ক্লাস নিতেন। উনি দারুণ সহজ করে কঠিন জিনিস পড়াতেন, খুব ভালো টিচার ছিলেন। আইবিএ এর স্টুডেন্টদের কাছে শুনেছিলাম, তিনি তাদের মাঝেও খুব জনপ্রিয় ছিলেন। নিজে হাসতেন না, কিন্তু উনার কথা শুনে ছাত্রছাত্রীরা হাসতে থাকত।

 

প্রথমদিন তিনি ক্লাসে এসে উনার পরিচয়টা বোর্ডে লিখলেন ড. মফিজুর রহমান, প্রফেসর, আইবিএ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাথে প্রতিষ্ঠান উল্লেখপূর্বক পিএইচডিসহ তাঁর ডিগ্রিগুলোও। এরপর স্লো মোশনে স্টুডেন্টদের দিকে ফিরে কৌতুকময় কিন্তু গম্ভীর গলায় সিরিয়াস মুডে বললেন, ‘ইনফ্যাক্ট আমি মফিজ’।

 

যা হোক, বেকুব থেকে বুদ্ধিমান হবার পরে ইয়োকোহামা স্টেশনে বিকেলে নেমে দুই ঘণ্টায় পদব্রজে ইয়োকোহামা শহরের বেশ কিছু অঞ্চল চষে বেড়ানোর পর টোকিওতে ফেরার আগে ভাবলাম ক্লান্তি দূর করতে আর বেকুব থেকে বুদ্ধিমান হওয়া সেলিব্রেট করতে ইয়োকোহামা স্টেশনের পাশে লেকের ধারে কফিশপে বসে ইয়োকোহামা শহরের স্মৃতি ধরে রাখতে এক কাপ কফি খাওয়াটা আসে।

 

সেখানে এক কাপ কফি খেয়ে ইয়োকোহামা স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে সন্ধ্যায় টোকিও স্টেশনে পৌঁছালাম। এবার কিন্তু ফিরতি পথে আর ভুল হয়নি। ৪৮০ টাকা দিয়ে লোকাল এমআরটি ট্রেনের টিকিট কেটে ঠিকঠাক যায়গায় গিয়ে ঠিকঠাক ট্রেনে উঠেই সদ্য বুদ্ধিমান হওয়া এক বেকুব ইয়োকোহামা স্টেশন থেকে টোকিও স্টেশনে ফিরেছে। এই জন্যই বলেছিলাম, জীবনে কোনো শিক্ষাই বিফলে যায় না।

 

অনেকেই হয়তো জানেন, ইয়োকোহামা টোকিও সিটি থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরত্বের জাপানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শহর যা ইকোনমিক, কালচারাল ও কমার্শিয়াল হাব হিসেবে পরিচিত।

 

এখন থেকে প্রায় ১৬৫ বছর আগে ১৮৫৯ সালে এই শহরের মাধ্যমেই বহির্বিশ্বের সাথে, মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে জাপানের পুনঃসংযোগ স্থাপিত হয়েছিল তার আগে প্রায় ২০০ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পরে।