১২ মে ২০২৬ তারিখে ৮৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন মঞ্চসারথী আতাউর রহমান যাঁকে বাংলাদেশের নাট্যজগত ও সাংস্কৃতিক জগতের সবাই আতা ভাই নামে চিনতেন।
গত কয়েকদিনে তাঁর স্মরণে অনেকগুলো স্মরণসভা হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে তাঁকে স্মরণ করে তাঁর স্মৃতি নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদসহ কাছাকাছি বয়সের সিনিয়র অনেক নাট্যজন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব; অনেকে অনেক স্মৃতিকথা লিখেছেন পত্রিকার পাতায়, বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে।
উনার সাথে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিটিভির অডিটোরিয়ামে স্টেজ শেয়ার করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার যেখানে আমি থাকতাম জাজ প্যানেলে আর আতা ভাই থাকতেন প্রতিযোগিতার চেয়ার হিসেবে। উনি সবার আতা ভাই, তাই আমারও আতা ভাই; তবে বয়সে উনি আমার বাবার চাইতেও ৪ বছরের সিনিয়র মানুষ ছিলেন।
বেশ কয়েকবার আমার আরও সৌভাগ্য হয়েছে পরপর দুইটি প্রোগ্রামের মাঝের সময়টাতে স্টেজের পেছনে বসে এবং প্রোগ্রাম শুরুর আগে বিটিভির ভিআইপি গেষ্টরুমে অপেক্ষারত অবস্থায় চা পান করতে করতে এই গুনীজনের সাথে আলাপচারিতার।
কোনো কোনো দিন এমনও হয়েছে যে, বিটিভিতে প্রোগ্রাম শেষ হলে আমি ফেরার পথে কখনো ঢাকা ক্লাবে আবার কখনো অন্য কোনো গন্তব্যে উনাকে নামিয়ে দিয়ে এসেছি। সেসময় গাড়িতে বসেও অনেক আলাপ হতো।
উনাকে আমরা ছোটবেলা থেকেই বাবার চরিত্রে, চাচার চরিত্রে টেলিভিশনের বিভিন্ন নাটকে দেখে আসছি। এর পাশাপাশি মঞ্চ নাটকে, বিভিন্ন থিয়েটারে ছিল উনার সমৃদ্ধ পদচারনা।
বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন উনি, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ছিলেন একাধারে নাট্যকার, লেখক, নির্দেশক এবং অভিনেতা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকের নির্দেশনার মাধ্যমে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে রক্তকরবী, গ্যালিলিও, ম্যাকবেথ এর মতো অনেক নাটকের নির্দেশনায়/অভিনয়ে ছিলেন তিনি।
একুশে পদক পেয়েছেন, স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন গুনী নাট্যজন আতাউর রহমান।
প্রথমদিন পরিচয় পর্বের আলোচনাতেই জানতে পারলাম যে তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান কিংবা রসায়নে অনার্স-মাষ্টার্স করেছিলেন বোধহয়। নাট্য আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন।
আতাউর রহমান, ডঃ ইনামুল হক, আবুল হায়াত, রামেন্দু মজুমদাররা একসাথে বা কাছাকাছি সময়ে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন নাট্যজগতে তাঁদের সরব পদচারনা পরবর্তীতে যার হাল ধরেছিলেন আলী যাকেরসহ আরও অনেকে।
যখন উনার সাথে আমার খুব কাছাকাছি থেকে আলাপচারিতার সুযোগ হলো, তখনি উনার বয়স আশি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কেবল বাংলা সাহিত্যই নয়, অবলীলায় আলাপ-আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে বলে চলতেন শেক্সপীয়ারসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক কবি/সাহিত্যিক/লেখক/নাট্যকারের বিভিন্ন বইয়ের হুবহু সংলাপ লাইনের পর লাইন।
নাটকের দল নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারফর্ম করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেও শোনাতেন অনেক স্মৃতিকথা।
আমরা আমাদের ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় নাটকে, সঙ্গীতে একসঙ্গে অনেক বড় একটা সংখ্যার একঝাঁক সমৃদ্ধ তারকা পেয়েছিলাম যাঁদের মাঝ থেকে এক এক করে সবাই চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে; খালি হয়ে যাচ্ছে প্রতিশ্রুতিশীলতার, একাগ্রতার, জ্ঞানসমৃদ্ধির জায়গাগুলো।
– আনোয়ার পারভেজ শেফীন
– চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ
#মঞ্চসারথী_আতাউর_রহমান_Ataur_Rahman_written_by_Anwar_Pervez_Shefin

