Blog

ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে কোন কারন ছাড়াই কৌতুহলী চোখে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো যদি একটি ঘোড়ারোগ হয়, তাহলে সন্দেহাতীতভাবে আমি সেই রোগে আক্রান্ত । পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন শহরে গেলে বিজনেস একটিভিটিজের অবসরে সেখানকার বিখ্যাত প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি সেই শহর বা তার উপকন্ঠের খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা আমার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে । সম্ভবতঃ আমার মাঝে এই ঘোড়ারোগের জন্মের পেছনে বেশ কয়েকটি কারন রয়েছে ।

বদ্ধ জায়গার চাইতে খোলামেলা বৃক্ষরাজির ছায়ায় আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক স্হান আমার বেশি পছন্দ যা মিউজিয়াম ঘুরে দেখার সময়টাতে পাই না । ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলোতে পুরোটা সময় জুড়ে না হ’লেও এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাওয়ার মাঝে খোলা আকাশের নীচে হেঁটে বেড়ানো যায় খানিকটা সময়, উপভোগ করা যায় চারপাশের প্রকৃতির সবুজাভ নির্যাস আর আশেপাশের ল্যান্ডস্কেপ ।

ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আমি দারুণভাবে উপভোগ করি তারুণ্যের প্রাণস্পন্দন যা দেখলে কিছুটা হ’লেও সেই দেশের, সেই শহরের এমনকি সমসাময়িক বৈশ্বিক তারুণ্যের অভিব্যক্তি, সংস্কৃতি, ফ্যাশনের একটা মোটামুটি ধারনা পাওয়া যায় । এই ধারণা থেকে হালজামানার ট্রেইন্ড সম্পর্কে যেমন আপডেটেড হওয়ার সুযোগ থাকে, আবার প্রাণোচ্ছল তরুণদের উদ্দীপনা কাছে থেকে দেখলে মনের বয়স কমে আর নিজেদের ফেলে আসা ক্যাম্পাস জীবনের কথা মনে পড়ে যায়, মস্তিষ্কের নিউরনে নষ্টালজিকতা খেলা করে । মনটা তখন বেশ ফুরফুরে লাগে ।

আরও কারন আছে । ছোটবেলা থেকে অনেক বড় বড় বিদ্বান ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে গিয়ে যখন বই-পুস্তকে, পত্রিকায় পড়তাম যে উনারা অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহন করেছেন তখন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি একটা আগ্রহ মনের মধ্যে তৈরি হয়েছিলো যা আরও বেশি প্রবল হয়েছিলো যখন বুয়েটে পড়ার সময় বা বুয়েট থেকে পাস করার পরে অনেক বন্ধু এবং বড়/ছোট ভাইবোনদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিগুলোতে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে যাওয়ার খবর পেতাম । আর স্যোশাল মিডিয়া চালু হওয়ার পরে সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া পরিচিতজনদের বিভিন্ন এ্যাকটিভিটিজের ফটো, কনভোকেশনের ফটো, এ্যাওয়ার্ড গ্রহণের ফটো বা ভিভিও, কনভোকেশন ক্যাপ বাতাসে উড়ানোর ফটোগুলি যখন নিউজফিডে চলে আসে, তখন সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে গত দেড় যুগে ।

আর একটি কারনকে স্বীকার না করলে হয়তো বিশ্লেষণটি নিরপেক্ষ হবে না । ‘নদীর এপারে বসে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস’ – কৈশোরকাল থেকেই এই উক্তিটির ভাব সম্প্রসারণ লিখে আসছি পরীক্ষার খাতায় । এটা প্রতিটি মানুষের মাঝেই অবচেতনমনে তৈরি হওয়া একটা খুবই সাধারণ অনুভূতি ।

বুয়েট থেকে আন্ডারগ্র্যাড শেষ করে রেজাল্ট বেরুনোর আগেই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলাম । এরপর গাধার খাটুনি খাটতে খাটতে আমি যখন জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকার ধুলোমাখা, জনাকীর্ণ রাস্তার ট্র্যাফিকজ্যামে এখান থেকে সেখানে ঘুরতে ঘুরতে কর্মক্লান্ত, তখন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষার্থে এক এক করে উড়াল দিলো মূলতঃ আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় ; আর সেইসাথে ইউরোপ, এশিয়ার হাতে-গোনা কয়েকটি বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিতে । তখনও মনে হয়েছিলো, চাকুরি ছেড়ে দিয়ে আমিও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে মনোনিবেশ করি । কিন্তু করি-করি করেও আর করা হয়ে উঠলো না । এরপর সংসারধর্মে জড়িয়ে পড়লাম, সন্তানের পিতা হলাম, চাকুরির পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করলাম, অতঃপর ব্যবসা ; এই তো জীবন, চলছে জীবনের মতো । কিন্তু পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্খা আমার অধরাই রয়ে গেলো । সম্ভবতঃ সে কারনেই যা পাওয়া হ’লো না, তা একটু ছুঁয়ে দেখার অভিপ্রায় হয়তো হয় মনের গহীনে ।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রজীবনে আমাদের আড্ডাবাজিতে বন্ধুদের পরস্পরকে কিডিং করার একটি সংলাপ মনে পড়ে গেলো । মাঝে মাঝে আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্কুল/কলেজ জীবনের বন্ধুরা যখন আড্ডায় বসতাম, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা যখন তাদের মনোরম সুন্দর সাজানো-গোছানো ক্যাম্পাসের বর্ননা জাহির করতো, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা তাদেরকে পচানোর জন্য বলতো, ‘শোন, একজন শিক্ষার্থী যদি একদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কলাভবন, মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি, ডাস, কার্জন হল, বাংলা একাডেমি, তিন নেতার মাজার, শহীদ মিনার, এনেক্স ভবন, হেয়ার রোড, চারুকলা, পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ, নজরুল-জয়নুলের সমাধিসৌধ আর কয়েকটি আবাসিক হলের আশেপাশে দিয়ে একপাক ঘুরে আসে তাহলে তার চোখ যতটুকু খুলবে, তোদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪/৫ বছর পড়ে থাকলেও ততটুকু খুলবে না’ ।

অনেকটা সেরকম ভাবনা থেকেই হয়তো আমার অবচেতন মনে অনুভূত হয়, বিশ্ববিখ্যাত যেসব ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়ে উঠেনি, সেখানকার ক্যাম্পাসের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলে পুঁথিগত বিদ্যা বা সার্টিফিকেট অর্জন করতে না পারলেও সেখানকার ভাইবস্ সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যাবে যা একেবারেই ফেলনা নয় ।

তাই, ২০১৫ সালে ৪/৫ দিনের জন্য লন্ডনে গিয়ে যখন জানলাম অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ লন্ডন থেকে ভিন্ন ডিরেকশনে বেশ খানিকটা দূরত্বে অবস্হিত ভিন্ন দু’টি শহর, তারপরও ট্রেনে চড়ে সেই শহরগুলোতে গিয়ে কেমব্রিজ আর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার মনোবাসনা আমি নিবৃত্ত করতে পারি নাই, এমনকি কেমব্রিজের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা লেকে বোটে ঘুরে বেড়ানো আর লেক থেকে কেমব্রিজের বিখ্যাত সব কলেজকে এক নজর দেখার সুযোগও হাতছাড়া করি নাই । আবার লন্ডন শহরে পুরনো রয়্যাল নেভাল কলেজের ঐতিহ্যবাহী স্হানটিতে গড়ে উঠা টেমস নদীর তীরে University of Greenwich ঘুরে দেখেছি মুগ্ধ নয়নে । পরবর্তীতে ফ্যামিলি নিয়ে যখন গিয়েছি লন্ডনে, তখন স্ত্রী-সন্তানদেরকেও ঘুরিয়ে দেখিয়েছি ক্যাম্পাসগুলি ।

আবার ২০১২ সালে প্রথমবার যখন নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম কনফারেন্সে মাত্র ৪/৫ দিনের জন্য, তখন কেবল বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড আর এমআইটি দেখার দুর্নিবার আকর্ষণে একদিন ডে-ট্রিপে নিউইয়র্ক থেকে বাসে রওনা দিয়ে ৪/৫ ঘন্টা জার্নি করে বিকেলে বোস্টনে পৌঁছে বন্ধুদের সাথে এমআইটি আর হার্ভার্ড ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে সন্ধ্যার ফিরতি বাসে চেপে গভীর রাতে এসে নিউইয়র্কে পৌঁছেছি । পরবর্তী সময়ে ফ্যামিলি নিয়ে ইউএস ট্রিপের সময় আমি ট্যুর প্লানে বোস্টনকে রেখেছিলামই কেবল সহধর্মীনি আর বাচ্চাদেরকে হার্ভার্ড আর এমআইটি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখানোর জন্য ।

২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের সময় বন্ধুদের সাথে ক্যানবেরাতে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিডনিতে UNSW, ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনি, ব্রিসবেনে গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে । বিভিন্ন সময় সুযোগ হয়েছে সিঙ্গাপুরের NUS, NTU ক্যাম্পাসে কিছুটা সময় কাটানোর ।

লস এন্জেলসে আমার বন্ধু যুবায়ের আমাকে শান্তামনিকা বীচের পাশ দিয়ে মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে ড্রাইভ করতে করতে সমুদ্রপাড়ের এক উঁচু পাহাড়ি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়েছিল যার নাম ছিলো পিপারডাইন ইউনিভার্সিটি । যুবায়ের বলেছিলো ওটা ধনী মানুষের সন্তানদের পড়াশোনা করার এক্সপেন্সিভ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি । পাহাড়ি সেই ক্যাম্পাস থেকে নিচের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের নীলাভ জলরাশি ; চোখ জুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ ।

নিউইয়র্কে ইউনিভার্সিটি অফ কলাম্বিয়া আর টরেন্টোতে ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোর আশপাশ দিয়ে ঘুরাঘুরি করলেও ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে সময় নিয়ে উপভোগ করা হয়নি সময়-সুযোগের অভাবে ।

আর ২০২২ সালের শেষের দিকে কানাডার ভ্যানকুভারে গিয়ে তো আমি ক’দিন থাকার জন্য যে হোটেলে বুকিং দিয়েছিলাম সেইটা ছিলো একেবারে সেখানকার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অফ বৃটিশ কলাম্বিয়া (UBC) এর ক্যাম্পাসের ভিতরে । প্রতিদিন সকালে হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় আর রাতে হোটেলে ফিরেই মুগ্ধনয়নে দেখতে পেতাম নয়নাভিরাম বিশাল UBC ক্যাম্পাসে তারুণ্যের প্রানচঞ্চল পদচারনা ।

UBC ক্যাম্পাসে হাঁটা-চলার সময় এর ল্যান্ডস্কেপ আর তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রানবন্ত ছুটাছুটি দেখে ভাবতাম, আহ্ যদি পুরোটা জীবন এই ক্যাম্পাসের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারতাম একটার পর একটা কোর্সে ভর্তি হয়ে, যদি ভুতে আমার খরচ জোগাতো ! আর তা যদি কেবল ক্যাম্পাসে ঘুরাফেরা, আড্ডাবাজি আর ক্লাসে উপস্হিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো ! কারন, একের পর এক ক্লাসটেষ্ট, এসাইনমেন্ট আর মিডটার্ম/টার্ম ফাইনালের আগে পড়াশোনার ভয়াবহ মানসিক চাপের প্রতি আবার আছে আমার সীমাহীন ভীতি । ক্লাসে বসে শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট শিক্ষার্থী হিসেবে খুব মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের লেকচার শুনতে আমার বেশ লাগে !