Blog

তুরস্কের প্রাচীন রাজধানী (বর্তমানে যাকে বলা হয় বানিজ্যিক রাজধানী) এবং সবচাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইস্তাম্বুলের দুইদিক দিয়ে বয়ে চলেছে দুইটি সমুদ্র (Black Sea এবং Marmara) যার সংযোগ প্রণালী বসফরাস ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশকে আলাদা করেছে। দীর্ঘকাল আগে থেকে আজ অবধি ইস্তাম্বুল শুধু তুরস্কের নয়, সমগ্র পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ শহর যার সাথে জড়িয়ে আছে বাইজেন্টাইন(রোমান) সাম্রাজ্য, অটোম্যান সাম্রাজ্যের বর্নাঢ্য ইতিহাস।

 

আবার তুরস্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ইজমিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে Aegean Sea যা তুরস্ককে গ্রীস থেকে আলাদা করেছে। অন্যদিকে তুরস্কের বিখ্যাত পর্যটন শহর আন্তালিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে Mediterranean Sea তথা ভূমধ্যসাগর যেটা বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনা করলে আটলান্টিকের অংশ। ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকা – এই তিন মহাদেশের সাথে সংযুক্ত স্থলবেষ্টিত পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ভূমধ্যসাগর। আন্তালিয়ায় বীচের পাশ দিয়ে গাড়ি চলাচলের সড়ক, আর বীচ ও সড়কের মাঝখান দিয়ে অতি প্রশস্ত এবং পর্যটকবান্ধব হাঁটার পথ আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। মনে হয়েছে, এই শহরে যদি আমি থাকতাম, তবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভূমধ্যসাগরের তীরে বীচের পাশে ওই রাস্তায় এক ঘন্টা হাঁটলে সারাদিনের কর্মক্লান্তি দূর হয়ে যেতো।

 

হাজারো বৈচিত্র্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরো তুরস্ক জুড়ে। যেমন আছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, তেমনি আছে ঐতিহাসিক স্থাপত্য। শুধু ইস্তাম্বুলের এক জায়গাতেই আছে তোপকাপি প্যালেস, আয়া সোফিয়া, ব্লু-মস্ক, ব্যাসিলিকা সিস্টার্নের মতো হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্যের বেশ কয়েকটি নিদর্শন যার অধিকাংশই ইউনেস্কো হেরিটেজ। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যও বোধহয় ইস্তাম্বুলের ওল্ডটাউনের এই ঐতিহাসিক স্হাপত্যগুলি।

 

পর্যটকদের জন্য রয়েছে বসফরাসে ফেরিতে করে দিনের বেলায় বিভিন্ন সময়ের ট্রিপ, আবার আলোঝলমল ইস্তাম্বুল শহর দেখা আর বসফরাসে ফেরিতে বসেই ডিনার ও তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী নাচগান উপভোগ করার জন্য রয়েছে রাতের নৌভ্রমণ যা শুরু হয় সন্ধ্যা পর, চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। আবার পর্যটকরা দিনের বেলায় কয়েক ঘন্টা ব্যয় করলে তাদের জন্য ফেরিতে করে মারমারা সাগর পাড়ি দিয়ে প্রিন্সেস আইল্যান্ডে ঘুরে আসার ট্রিপও রয়েছে।

 

রয়েছে ক্যাপাডোসিয়াতে গিয়ে হট এয়ার বেলুনে চড়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ। আরেকটি দারুন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ জায়গা রয়েছে তুরস্কে যার নাম পামুক্কালে যার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য এই জায়গাটিকেও ইউনেস্কো হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

 

সমূদ্রপড়ের শহর ইজমিরের কাছাকাছি আছে রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্নযুগের পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ইফেসাস যা ইউনেস্কো হেরিটেজ এবং সম্ভবতঃ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরকিওলজিকাল হেরিটেজ। বিশাল রোমান সাম্রাজ্যের সময় ইতালির রোমের পরেই তাদের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিলো এই ইফেসাস যার সংরক্ষিত   ধ্বংসাবশেষ কালের সাক্ষী হিসেবে এখন বিখ্যাত ও আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

ইফেসাসের পাশেই একটু পাহাড়ের উপরে আছে ভার্জিন মাদার ম্যারির বাড়ি যেখানে তিনি যীশুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেইন্ট জন এর সাথে এসে জীবনের শেষ সময়গুলোতে বসবাস করেছিলেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে বিশ্বাস করেন পৃথিবীর একটি বড় জনগোষ্ঠী যদিও বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। এটিও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিজনেস ট্রিপে অনেকবার আর ফ্যামিলি ট্রিপে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুইবার তুরস্কে গিয়ে সেখানকার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লিখছি।

 

বলে রাখা ভালো, হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যে বর্ণিত ট্রোজান যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সেই যে হেলেনের ট্রয় নগরী সেটাও কিন্তু তুরস্কে। উনিশ শতকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা খননের মাধ্যমে তুরস্কে এই ট্রয় নগরীকে আবিষ্কার করে যা পরবর্তীকালে ইউনেস্কো হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

 

এছাড়াও তুরস্কের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আরও অনেক বৈচিত্র্য। ২০২৪ এর এপ্রিলে আমি যখন আমার বিজনেস পার্টনারকে নিয়ে তুরস্কের কয়েকটি শহরে বিজনেস ট্রিপে ছিলাম, তখন জার্মানির ফ্রাংকফুটে স্হায়ীভাবে বসবাস করা আমার এক বুয়েটিয়ান ছোট ভাই আমাকে বলছিলো যে, তার ভিজিট করা পৃথিবীর শহরগুলোর মধ্যে তার কাছে ইস্তাম্বুলকে সবচাইতে ডাইভারসিফাইড বৈচিত্র্যের শহর মনে হয়েছে।

 

আবার ২০২৪ সালের জুন মাসের শেষের দিকে আমি যখন আমার ফ্যামিলি নিয়ে লন্ডন থেকে ইস্তাম্বুলে আসছিলাম, তখন লন্ডনে স্হায়ীভাবে বসবাসরত আমার এক আইটি স্পেশালিষ্ট বন্ধু বললো যে, তুরস্ক তার সবচাইতে পছন্দের দেশ এবং সে এপর্যন্ত ১৪ বার তুরস্কে গিয়েছে।

 

বিজনেসের কারনে আমার কোম্পানি পাওয়ারব্রীজের যতগুলো আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের সাথে বিজনেস পার্টনারশীপ আছে, তার মধ্যে জার্মানি, ইউকে, বেলজিয়াম, সুইডেন, ইতালি, স্পেন, ভারত, সিঙ্গাপুর, চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি এককভাবে সবচাইতে বেশী টাই-আপ আছে তুরস্কের অনেকগুলি কোম্পানির সাথে অনেকগুলো ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাক্টস্ -এর ব্যাপারে, যে কারনে মাঝে মাঝেই আমার তুরস্কে যেতে হয়। তাই খুব কাছে থেকে বারবার বিষয়গুলো আমার মনোযোগ কেড়েছে।

 

এতক্ষন তো পজিটিভ কথা বললাম ; এবার কয়েকটি নেগেটিভ কথা বলি। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্লাটফর্মের প্রোফেশনাল জায়গায় কাজ করা অতি সামান্য কিছু মানুষ ছাড়া সম্ভবতঃ তুরস্কের মোট জনগোষ্ঠীর ৯৫% মানুষ ইংরেজির কিছুই বুঝে না অনেকটা চাইনিজদের মতোই ; এমনকি Water, Rice, Yes, No, Come, Go এইগুলোও বুঝে না। ফলে কমিউনিকেশন একটি বড় সমস্যা যা অবশ্য গুগল ট্রান্সলেটরের কারনে এখন কিছুটা সহজ হয়েছে। টেক্সট এবং ভয়েস দুইভাবেই ট্র্যান্সলেট করে নেওয়া যায় মোবাইলের এ্যাপস্ ব্যবহার করে।

 

আরেকটি কথা, তুরস্কের অন্য শহরগুলিতে ঠকবাজ তেমন না থাকলেও সবচাইতে বড় শহর ইস্তাম্বুলে যেমন ভাল মানুষ আছে, তেমনি তা টাউট-বাটপার আর ঠকবাজে ভরপুর। ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে আইসক্রিম বিক্রেতা পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নজন পর্যটকদের ঠকানোর চেষ্টা করবে সুযোগ পেলেই। কিছু দুষ্টু ট্যাক্সিচালকদের প্রতারণার একটি বিশেষ কৌশল নিয়ে আমি একটি গল্প লিখেছি যা এই বইটিতেই আছে যার শিকার আমি হয়েছিলাম ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ারকালে ফ্যামিলি নিয়ে ইস্তাম্বুলে ৩ দিন থাকার সময়। জনপ্রিয় লেখক ও কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও শাওনকে বিয়ে করার কিছুদিন পরে অতি তরুণী নববধূকে নিয়ে সারপ্রাইজ ভিজিটে ইস্তাম্বুলে বেড়াতে গিয়ে ট্যাক্সি-ড্রাইভার কর্তৃক একই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন যা তিনি তাঁর একটি উপন্যাসে লিখে গেছেন।

 

২০২৪ সালের সামারে ফ্যামিলিট্রিপের সময় ইস্তাম্বুলের সিটিসেন্টার সুলতানহ্যামেটে ঘুরেফিরে ক্লান্ত হয়ে পার্শ্ববর্তী ম্যাগডোনাল্ডস্-এ লাঞ্চ করে বের হয়ে হঠাৎ পাশেই আইসক্রিমের দোকান দেখে বাচ্চাদের আইসক্রিম খাওয়ার ইচ্ছে হলো। ওরা ক্রেতার হাতে আইসক্রিম সার্ভ করার সময় ম্যাজিক্যাল সার্কাস টাইপের খেলা দেখায় এন্টারটেইনমেন্ট দেওয়ার জন্য। অন্য সময় যে কোন কিছু কেনার ক্ষেত্রে দাম দেখে নেওয়ার স্বভাব থাকলেও ওইদিন হঠাৎই আগের কাস্টমারকে সার্কাস দেখিয়ে আইসক্রিম বিক্রেতা আইসক্রিম সার্ভ করার পরপরই আমরা চারটি আইসক্রিমের অর্ডার দিলাম, দাম জেনে নিতে মনে ছিলো না ; ভেবেছিলাম কতোই আর হবে!

 

আইসক্রিম নেওয়ার পরে দাম জিজ্ঞেস করতেই তারা বললো যে, একেকটা আইসক্রিমের তাম ২৫০ তার্কিশ লিরা অর্থাৎ বাংলাদেশি এক হাজার টাকা যা তুরস্কের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে ৩/৪ গুন বেশি। বাধ্য হয়ে আমাদের তখন ৪-টি আইসক্রিমের দাম ১ হাজার তার্কিশ লিরা অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ৪ হাজার টাকা দিতে হলো। কাজেই, ইস্তাম্বুল শহরে চলাফেরা করতে হ’লে সবকিছু বুঝে-শুনে চোখ-কান খোলা রেখে চলতে হয় ঠকবাজদের কবল থেকে রক্ষা পেতে।

 

আরেকটি কথা, তুরস্কের বিভিন্ন শহরের এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন কিংবা মেট্রো স্টেশনের ওয়াশরুমগুলির মধ্যে সামান্য কিছু সংখ্যক টয়লেটে হাইকমোড থাকলেও অধিকাংশ টয়লেটে কিন্তু লো-কমোড। তাই তুরস্কের এক শহর থেকে দূর-দূরান্তের আরেক শহরে যাওয়ার সময় বাসটার্মিনালে, যাত্রাবিরতির স্থানগুলিতে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয়েছে নিজেকে বিজনেস ট্রিপের সময় এবং ফ্যামিলিট্রিপের সময় পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে আরও প্রকটভাবে।

 

আরেকটি দারুন বিষয় আছে। সেটা হলো তাদের হাইকমোডের পেছন দিকের নজেল যা আমাদের পুশ শাওয়ারের চাইতেও আরেকটু স্মার্ট, অবশ্য এর চাইতে আরো খানিকটা স্মার্ট ভার্সন আমি জাপানে গিয়ে দেখেছি ২০২৩ সালে। টোকিওতে হোটেলের ওয়াশরুমে দেখেছি কমোডের সামনের ওয়ালে হাতের নাগালে একটা টাচপ্যানেল থাকে যেখানে বেশ কিছু অপশন রাখা হয়েছে Male এবং Female ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনীয়তার সাথে মিল রেখে যুৎসই অপশনে টাচ করে পুশ শাওয়ারের সুবিধাজনক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য।

 

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইউরোপ-আমেরিকা-কানাডা-অস্ট্রেলিয়া-ইউকে সহ ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের সাদা চামড়ার মানুষজন নিজেদেরকে যতই বনেদি, অগ্রগামী, সভ্য এবং স্মার্টই মনে করুক না কেন ; আর কথায় কথায় হাইজিন আর কমপ্লায়েন্সের বুলি আওড়াতে আওড়াতে মুখে যতই ফেনা তুলে ফেলুক না কেন, টয়লেটে আমাদের মত পুশ-শাওয়ার কিংবা তুরস্ক-জাপানের মত কমোডের সাথে ইনবিল্ট নজেল সিস্টেমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা আজ অবধি ওই ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তথা হাইজিন প্র্যাকটিস করতে শিখলো না! এই বিষয়টিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার মানুষজনের ব্যক্তিগত প্রাত্যাহিক জীবনাভ্যাসের সবচাইতে নিম্নমানের, অস্বাস্থ্যকর অরুচিকর ও আনহাইজিনিক অভ্যাস ব’লে আমার কাছে বরাবরই মনে হয়।