Blog

সময়টা তখন ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর । বুয়েটের শেষ টার্মের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে থিসিস পেপার জমা দেবার জন্য কাজ করছি । একদিন হঠাৎ EME Building এর দেয়ালে দেখলাম Energypac নামের একটি কোম্পানির Walk-in-interview -এর সার্কুলার । ঐসময় যেহেতু ব্যাচের সবাই ক্যাম্পাসেই ঘুরাঘুরি করতো, তাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা সবার মাঝে চাউর হয়ে গেল ।

 

পরদিন সকালে অনেকেই গিয়ে হাজির হলো Energypac এর মতিঝিলের অফিসে । দুই কিংবা তিন দফা ইন্টারভিউ দিয়ে আমরা কয়েকজন জয়েন করলাম ।  চাকুরি শুরু করেছি । ক্যাম্পাসে একদিন এক ব্যাচমেট জিজ্ঞেস করলো, “কি রে দোস্ত, তুই নাকি Transformer আর Switchgear ফেরি করে বিক্রি করার চাকুরি নিছস ?“ । সে কি দুষ্টুমি না-কি তাচ্ছিল্য করে বলেছিলো তা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি ।

 

এরপর আস্তে আস্তে বন্ধু-বান্ধবদের একটা বড় অংশ USA -তে চলে গেল । দেশে সেসময় Telecom Industry -তে জোয়ার চলছিল । অনেকে Telecom জগতের চাকচিক্যময় কর্পোরেট চাকুরিতে জয়েন করলো । কেউ কেউ বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরিতে , কেউবা বিভিন্ন কর্পোরেশনে, সায়ত্ত্বশাসিত সংস্হায় জয়েন করলো ।

 

ঐ সময়গুলিতে আত্নীয়, প্রতিবেশী, পরিচিতজনদের মধ্য থেকে যে যেভাবে পারতো জ্ঞান দিত ; কেউবা শুভাকাঙ্খীর মত আন্তিরকতার সাথে, আর কেউবা কিঞ্চিৎ  তাচ্ছিল্যের সুরে । সম্পূর্ণ অশিক্ষিত মানুষ থেকে শুরু করে ডিপ্লোমা, পাসকোর্সে বিএ পাস/ফেল করা অনেকেও জ্ঞান দিয়েছেন । তাদের বক্তব্য, “বুয়েট থেকে পাস করা ছেলেমেয়েরা পাস করে আমেরিকায় যায়, টেলিকমে কিংবা BATB, Unilever, Chevron টাইপের Top Level Multinationals এর হাইফাই কর্পোরেট এনভায়রনমেন্টে উচ্চ বেতনে চাকুরি করে, বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরি করে, সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন PDB/REB/DESA/DESCO/DPDC/PGCB/University/PETROBANGLA/BCIC/City Corporation/WASSA /LGED- তে চাকুরি করে । আর তুমি কি সারাজীবন Transformer, Switchgear, Generator, BBT, Air Compressor টাইপের এইসব প্রোডাক্ট ফেরি করে বিক্রি করবে ? “ । এইটা কিছু হইলো !

 

তোমার বাবা-মা দুইজনই মাস্টার্স পাস শিক্ষিত মানুষ ; তোমার  হ্যান্ডসাম মুক্তিযোদ্ধা বাবা সে-ই পাকিস্তান আমলে এপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করে আজীবন নাটোরে, ঢাকায় বিভিন্ন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন ; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, সিনেট, একাডেমিক কাউন্সিল সদস্য ছিলেন, বিভিন্ন কলেজ-মাদ্রাসার গভর্নিং বর্ডির চেয়ারম্যান ছিলেন ; তোমার ডাবল এমএ পাস করা মা হাইস্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেড-মিস্ট্রেস ছিলেন ; তুমি ছোটবেলা থেকে নাটোর জেলার অন্যতম সেরা ছাত্র ছিলে ; আবৃত্তি-বিতর্ক-উপস্হিত বক্তৃতা-রচনা প্রতিযোগিতা-দেয়াল পত্রিকা-সহ কতো রকমের কো-কারিকুলার/এক্সট্রাকারিকুলার  অ্যাকটিভিটিসে সেই ছোটবেলা থেকেই তুমি অসম্ভব একটিভ ছিলে ; ঢাকা কলেজে পড়লা, বুয়েটে পড়লা, জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হইলা, শ্রেষ্ঠ বক্তা হইলা, বুয়েটে পড়ার সময় আরও কতো রকমের হাবিজাবি কাজকর্ম কইরা বেড়াইতা শুনতাম – আর কি-না শেষ পর্যন্ত ফেরিওয়ালার মত হকারি করে বেড়াচ্ছো মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে যারেতারে মুখে ‘স্যার’, ‘স্যার’ ব’লে ফেনা তুলে ? OMG !  ছি: ছি: ছি: !  মানুষ কি বলবে !

 

কখনো কখনো এই ধরনের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে নিরবতা অবলম্বন করতাম, আর কখনো বলতাম যে, আমি যদি এটাই করি তাহলে অন্য কারও কোন সমস্যা তো হচ্ছে না । এটা করতে Interest পাচ্ছি বলতাম না এই কারনে যে তাহলে অনেকে এমন Reactive Look দিতো যার মানে দাঁড়াতো “আঙ্গুর ফল টক“ ।

 

দিনগুলো খুব কঠিন গেছে । খুব ঘনিষ্ঠ যারা তাদেরকে বলতাম , জীবনটাই তো ক’দিনের । কিছু একটা করে কাটিয়ে দিলেই তো হলো । একবার এক উপযাজক জ্ঞানদাতার উপর একটু বেশি রাগ হওয়াতে তাকে বলেছিলাম, “বিল গেটস্ সফটওয়ার ফেরি করে বেচলে দোষ হয়না, স্টিভ জবস্  iPhone ফেরি করে বেড়ালে দোষ হয় না ; আর যত দোষ এই গরিব দেশের গরিব ফেরিওয়ালাদের ! “ । শুনে তিনি এমন লুক দিয়েছিলেন যার অর্থ ছিল, “ছোট মুখে বড় কথা ! “ ।

 

এরপর থেকে Transformer, Switchgear, Generator, BBT,  Panels, Cooling Tower, Air Compressor -সহ আরো কিছু ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল প্রোডাক্টস্ আর সার্ভিসেস বেচেই দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছি জীবন । আগে চাকুরি করতাম, এখন ব্যবসা করি ; পার্থক্য এই যা ।

 

কয়েক বছর নিজের প্রতিষ্ঠান পাওয়ারব্রীজ -এর ট্রান্সফরমার, সুইচগীয়ার, জেনারেটর, BBT ফেরি করে বিক্রি করার পর ২০১২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে টাইম স্কোয়ারের ম্যারিয়ট হোটেলে অনুষ্ঠিত New York Quality Summit Convention থেকে আমার প্রতিষ্ঠান পাওয়ারব্রীজের প্রতিনিধি হিসেবে BID -এর একটি Business Excellence Award রিসিভ করতে গিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াতে তা দেখে আমেরিকা প্রবাসী আমার এক অধ্যাপক বন্ধু ফোন করে বললো, “মামা তুই আম্রিকা চইলা আইছস !“ । ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে পৃথিবীর একটি শীর্ষ আইটি কোম্পানিতে চাকুরি করা এক বন্ধু বললো, “I feel you deserve this recognition“. কোন মন্তব্যটি উৎসাহমূলক, কোনটি সম্মাননামূলক, আর কোনটি বিদ্রুপাত্নক তা যাচাই করার চেষ্টা করিনি ।

 

এরপর থেকে অনেকবার কখনো ব্যবসার কাজে, কখনো টেকনিকাল সেমিনারে Attend করতে কিংবা কখনো নিছক হলিডে কাটাতে USA, Canada, UK, Australia, Europe, Asia এর প্রায় অধিকাংশ বিখ্যাত দেশে/শহরে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে । গরিব দেশের গরিব ফেরিওয়ালা বলে First World -এর উন্নত দেশের উন্নত শহরে গিয়ে অনেক কিছু দেখে কিছুটা অবাক হই, তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই । তা দেখে ওইসব উন্নত দেশে বাস করা অনেক বন্ধু, আত্নীয় আড়ালে টিপ্পনী কেটে বলে, “কি আজব রে বাবা ! এইসব জায়গায় গিয়ে ছবি তুলে স্ট্যাটাস দেবার কি আছে ?“ । তারা বিষয়টি এইভাবে চিন্তা করে না যে, তারা ওখানে থাকে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ; আর আমরা যাই জীবনে অল্প সংখ্যকবার । তাই তারা ‘Used to’ হওয়াতে অনেক কিছুতেই অবাক না হলেও আমরা সামান্য কিছু বৈচিত্র্যময় জিনিস দেখে অবাক হতেই পারি, মুগ্ধ-বিষ্ময়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতেই পারি । বিষয়টি কারও পছন্দ না হলে সে Unfriend করে দিতে পারে । তাই বলে উপহাস কেন ?

 

এখনো কোন অতি উৎসাহী অতি জ্ঞানী আত্নীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী যখন জিজ্ঞেস করে, “কি খবর তোমার ?  কি করছো এখন ? ক্যারিয়ারের ভাল কোন গতি হলো ?“ । আমি উত্তর দেই, এখনো আগের মতই বিভিন্ন ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং প্রোডাক্টস্ আর সার্ভিসেস মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ফেরি করে বেচি ।

 

আমি এক আজীবন ফেরিওয়ালা ; ফেরিওয়ালা ছিলাম, ফেরিওয়ালাই আছি ; অফিসার হওয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মাই নাই তো  !

 

দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছি জীবন, মানিয়ে নিচ্ছি, জীবন কেটে যাচ্ছে জীবনের মত ; হয়তো রক্ত ঝরছে না ; তবুও বেশ তো আছি  !