সময়টা ছিলো ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি । আমরা তখন বুয়েটের শেষ বর্ষে অর্থাৎ লেভেল -৪, টার্ম-১ এ পড়ি । বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের, বিভিন্ন হলের ও বাসায় থাকা আমাদের বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা প্রকাশনা বের করেছিলো ; সহযোগিতায় সিনিয়র ও জুনিয়রদের কয়েকজনও ছিলো সম্ভবত: ।
প্রকাশনার সংখ্যা ছিলো এমন যাতে ৯-টি হলের প্রত্যেক রুমে একটি করে কপি, প্রত্যেক শিক্ষককে একটি করে কপি এবং বাসার ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করে দুপুরে সেন্ট্রাল ক্যাফেতে অবস্থানরত প্রত্যেককে এক কপি না দিতে পারলেও ক্যাফের প্রতি টেবিলে, ক্যাফের আশেপাশে এবং আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টির সবুজ চত্বরের বিভিন্ন জায়গায় দলবদ্ধভাবে বসে আড্ডা দিতে থাকা প্রতিটি গ্রুপকে ১-টি করে সংখ্যা দেওয়া যায় ।
সেই সাময়িকীতে তখনকার দিনের জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজন প্রতিথযশা স্বনামধন্য লেখক এবং বুয়েটের প্রখ্যাত কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ এলামনির লেখাও সন্নিবেশিত হয়েছিলো রানিং স্টুডেন্ট ও শিক্ষকদের বেশ কিছু লেখার পাশাপাশি ।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হ’লো প্রকাশনার মূল দায়িত্বে থাকা আমার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু যখন কাটাবনের প্রেসে গিয়ে ফাইনাল প্রুফ দিয়ে আসলো প্রিন্টিংয়ের জন্য, তখন তাদের মধ্যে একজন এসে অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লজ্জিতভাবে আমাকে জানালো যে, বিভিন্ন জনের লেখা এবং স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলির এ্যাড ছাপানোর স্পেস ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে স্হান সংকুলানের অভাবে তারা শেষ পর্যন্ত ফাইনাল প্রুফে আমার লেখাটি দিতে পারেনি প্রেসে প্রিন্ট করতে দেওয়ার সময় । কাটছাটের অংশ হিসেবে আমার লেখাটি বাদ পড়ে গেছে ।
তরুন ছিলাম, কৃত্রিমভাবে ইমোশন আটকে রাখা শিখি নাই পুরোপুরি ; এমনকি প্রথম প্রেমের অভিজ্ঞতাও হয়নি তখনো । তাই, আমার চোখ দেখে আমার বন্ধুরা মনে হয় বুঝতে পেরেছিলো যে, ব্যাচারা মনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে ! এরপর শেষ মুহুর্তে অনেক রাতে প্রকাশনার মূল দায়িত্বে থাকা এক বন্ধু প্রেসে গিয়ে ব্যাক কাভার পেইজের এ্যাড বাদ দিয়ে সেখানে আমার লেখাটি সেট করে দিয়ে আসলো । প্রকাশনাটি যখন বের হ’লো, তখন দেখা গেলো ফ্রন্ট কাভারপেইজে মূল প্রচ্ছদ, আর ব্যাক কাভারপেইজে আমার লেখা । ২৬ বছর আগের সেই পুরনো সংখ্যা থেকে ব্যাক কাভার পেইজে ছাপানো আমার লেখাটি আমি স্ক্যান করে রেখেছিলাম বেশ ক’বছর আগে ।
হঠাৎ কেনো ২৬ বছর আগের এই পুরনো কাসুন্দির কথা বললাম ? ওই লেখাটিতে আমি মূলতঃ ফোকাস করেছিলাম সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও অর্থলিপ্সার সাথে ধীরে ধীরে কতিপয় ছাত্রনেতার সংশ্লিষ্টতা বেড়ে যাওয়ার কিভাবে ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতির ঋনাত্নক প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশকে কলুষিত করে তুলছিলো, অথচ একদিন ছাত্ররাজনীতির বলিষ্ঠতায় ‘৫২, ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১, ‘৯০ এসেছিলো বাংলাদেশে । পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সাদা-কালো-লাল-নীল-গোলাপী দলের ব্যানারে অতি মাত্রায় এক্সপোজড্ হয়ে যাওয়াতে সেটাও কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর জন্য অশনিসংকেত বয়ে নিয়ে আসছিলো তা-ও তুলে ধরার ক্ষীন চেষ্টা করেছিলাম সেই লেখাটিতে ।
আজ হঠাৎ মনে হ’লো, আমি হয়তো একজন চুনুপূটি হিসেবে ১৯৯৮ সালে এসব লিখে তেমন কিছুই উদ্ধার করতে পারি নাই, কিন্তু ২৬ বছর আগে এই বিষয়গুলি নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছিলাম যে ধরনের ভাবনাগুলিই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অগনিত শান্তিপ্রিয় ও সচেতন তরুণের ভাবনার জায়গা হয়ে উঠেছে, বিস্ফোরিত হচ্ছে তাদের সম্মিলিত কন্ঠে । তারা বলছে, জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির নামে ছাত্র সংগঠন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলবে না, শিক্ষকদেরও বিভিন্ন পদ-পদবীর লোভে লেজুড়বৃত্তির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে ।
আর হ্যাঁ, আমার ঐ লেখার শুরুতে বুয়েটের একটি খুবই সাধারণ ইন্টারেস্টিং ঘটনা দিয়ে শুরু করলেও মূলতঃ আমি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গনকেই ফোকাস করেছিলাম আমার লেখা আর্টিকেলটিতে ।
যদি কারো একটু ধৈর্য্য ও সময় থাকে, তবে স্ক্যান করে রাখা ২৬ বছর আগের এই পুরনো লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইলো । পাশাপাশি, ২৬ বছর আগের পুরনো প্রকাশনার স্ক্যান করা ফটোসম্বলিত এই পুরনো কাসুন্দির গল্প পোস্ট করাতে যদি কেউ বিরক্ত বোধ করেন, তবে আমি অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।

