Blog

২০২২ সালের অক্টোবরের শেষের দিকের কথা । যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মেগাসিটি শিকাগো থেকে কোন এক সন্ধ্যায় ফ্লাই করে কানাডার বৃটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যানকুভার এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌছালাম বেশ রাতে । সেখানে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে লাগেজ সংগ্রহ করে একটি ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম University of British Columbia (UBC) ক্যাস্পাসে । কারন, আমার হোটেলটি ছিলো UBC ক্যাম্পাসের ভেতরে । পশ্চিমের কোন বড় শহরে গিয়ে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক এই ধরনের হোটেলে অবস্হান আমার সেইবারই প্রথম ।

বুকিং কনফার্মেশন মেইলেই প্রোপার্টি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছিলো যে তাদের রিসিপশন বিকেল ৫:০০ টার পরেই বন্ধ হয়ে যায় । আমি সেখানে পৌঁছার পরে এন্ট্রান্স গেটের বাহিরে একটা ক্যাবিনেট টাইপের লকার পাবো যেটা খোলার জন্য একটা পাসওয়ার্ড আমাকে ইমেইলে পাঠানো হয়েছিলো যেই পাসওয়ার্ড দিয়ে লকার খুললে আমার নাম লেখা একটি খাম পাবো যার ভিতরে রুমের কার্ড থাকবে । ওই কার্ড পাঞ্চ করে আমি মূল এন্ট্রান্স অতিক্রম করে হোটেলের ভিতরে ঢুকে লিফটে উঠে আমার রুমে গিয়ে কার্ড পাঞ্চ করে রুমে ঢুকতে পারবো ।

অনেক শংকা ছিলো, কারন, এতো রাতে এর আগে কোথাও গিয়ে আমি এভাবে কোন ক্লোজড্ প্রোপার্টিতে ঢুকি নাই কোনদিন । ওই ক্যাম্পাসের মধ্যেই কাছাকাছি একটা জায়গায় একটি এপার্টমেন্টে আমার বুয়েটের বন্ধু সাদিয়া আর তার হাজবেন্ড ফরহাদ ভাই থাকতেন । সাদিয়াকে বলে রেখেছিলাম যে, যদি আনাড়ি হওয়ার কারনে জায়গামতো চাবি খুঁজে না পাই, সেখানে কারও সহায়তা গভীর রাতে না পাই, তাহলে সাদিয়া আর ফরহাদ ভাই যেন আমাকে উদ্ধার করেন । কারন সেই গভীর রাতে তো হোটেলে ঢুকার আগ পর্যন্ত কোন কানাডিয়ান সীম বা ইন্টারনেট একসেস কিছুই থাকবে না আমার কাছে ।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত সফলভাবে পাসওয়ার্ড দিয়ে লকার খুলে আমার নাম লিখা খামের ভিতর থেকে রুমের কার্ড নিয়ে রুমে ঢুকতে সক্ষম হলাম । রুমে গিয়ে দেখি কোন এসি নাই । পরদিন জানলাম, সারাবছর ভ্যানকুভারে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া থাকে ব’লে তারা রুমে এসির অপশন রাখে নাই ; কারও সাফোকেশন হ’লে জানালা খুলে দিতে পারে । উল্লেখ্য যে, ভ্যানকুভার সম্ভবতঃ কানাডার সবচাইতে ব্যয়বহুল সিটি । তাই ক্যাম্পাসভিত্তিক ওই সাধারন থ্রি-স্টার মানের হোটেলের ভাড়াও ২০২২ সালে ছিলো বোধহয় প্রতিরাতের জন্য ১২৫ ইউএস ডলার । ফ্যামিলি ছাড়া একা পশ্চিমে গেলে এটাই প্রতি রাতের জন্য আমার হায়েষ্ট বাজেট যদি না কোন কনফারেন্সে গেলে সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাদের বাজেটে বিলাসবহুল কোন হোটেল/রিসোর্ট আমার জন্য বুকিং না দেয় ।

অনেক রাতে হোটেলের রুমে ঢুকার শংকা কেটে গেলো বটে, কিন্তু পেটের সীমাহীন ক্ষুধা মিটাবে কে ? খাবার পাবো কোথায় ? প্রোপার্টির মধ্যে কোথাও কোন সহায়তাকারী নাই ! বের হয়ে পড়লাম পদব্রজে, যেহেতু মোবাইলে ইন্টারনেট নাই, তাই গুগল ম্যাপের সহায়তা নেওয়ার সুযোগও নাই । কিছুদূর হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে কয়েকটি কুকুরের সাক্ষাৎ পেলাম, এরপর সাক্ষাৎ পেলাম এক যুবকের, রাত তখন প্রায় ০১:০০ টা । তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আশে-পাশে কোন খাওয়ার জায়গা পাওয়া যাবে ? সে হাত দিয়ে ডান-বাম ইশারা করে মুখে বললো যে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে একটি ২৪/৭ খোলা ম্যাগডোনাল্ডস আছে ।

তা শুনে রীতিমতো জানে পানি পেলাম, কারন ক্ষুধা নিবারনে আপ-ডাউন তিন কিলোমিটার হাঁটা কোন ব্যাপার না । গভীর রাতে পথ একটু নির্জন হলেও কোন কোন জায়গায় লাইব্রেরীর মতো কিছু স্হান চোখে পড়ছে যার ভেতরে UBC এর ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা করছে ব’লে মনে হ’লো । শেষ পর্যন্ত ম্যাগডোনাল্ডসটা খুঁজে পেয়ে সেটাকে খোলা দেখে মনে হ’লো, ” পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম” । পেটপূজা সম্পন্ন করে রুমে ফিরে ঘুম, সকালে ঘুম ভাঙলো বুয়েটের আমার ডিপার্টমেন্টের বন্ধু পলাশের হোয়াটসঅ্যাপ কলে । তার বাসা অনেক দূরে, UBC থেকে বোধহয় ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে তো হবেই । সেখান থেকে সে কাকডাকা ভোরে রওনা দিয়ে চলে এসেছে বন্ধুকে নিয়ে বেরুবে ব’লে ।

পলাশকে বললাম, দোস্ত সকালের নাস্তা তো করতে হবে, প্রোপার্টিতে নাস্তার ব্যবস্হা নাই । পলাশ জানতে চাইলো, আমি কি ভ্যানকুভার দেখবো, না-কি বৃটিশ কলাম্বিয়া দেখবো ? ওর উসকে দেওয়া প্রশ্ন শুনে আমাকে আর পায় কে ? আমি বললাম, বৃটিশ কলাম্বিয়া । সে বললো, তাহলে নাস্তা করার জন্য কোথাও গিয়ে আর সময় নষ্ট করা যাবে না ।

UBC ক্যাম্পাস থেকে একটা বাসে করে আমরা এক জায়গায় গিয়ে নামবো, সেখান থেকে একটা মেট্রোতে চড়ে আরেক জায়গায় গিয়ে নামবো, সেইখান থেকে একটা বাসে চড়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে একটা বিশাল নদীর এপারে নেমে ফেরিতে চওড়া এক নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে আরেকটি বাসে চেপে পৌঁছাবো বৃটিশ কলাম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়াতে । এভাবেই পৌঁছে গেলাম ভিক্টোরিয়া । প্রায় ২-৩ ঘন্টা পদব্রজে ভিক্টোরিয়া শহর, বৃটিশ কলাম্বিয়ার পার্লামেন্ট হাউজ, ভিক্টোরিয়া হারবার আর এর আশেপাশের এলাকায় ঘুরাঘুরি করে, হারবারে একটা রেষ্টুরেন্টে বসে সীফুড দিয়ে উদরপূর্তি করে পাশের এক দোকান থেকে একটা কানাডিয়ান সীম কিনে একই পথে আবার ফিরে আসলাম ভ্যানকুভারে । UBC ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর জন্য শেষ বাসে তুলে দিয়ে পলাশ তার নিজের বাসার অভিমুখে চলে গেলো পরদিন সকালে আবার আসবে বলে ।

এইদিনও রাত ১২:৩০ এর দিকে হোটেলে পৌঁছে পড়ে গেলাম আরেক বিপদে, পৌঁছে দেখি আমার কার্ড দিয়ে আর রুমের দরজা খুলছে না ; রিসিপশন তো বিকেল পাঁচটার পর থেকেই বন্ধ । ভাগ্যিস, ফেরার পথে ভিক্টোরিয়া থেকে মোবাইলের সীমটা কিনেছিলাম ! প্রোপার্টির মেইন এনট্রান্সে একটা ফোননম্বর লেখা ছিলো বিপদে সহযোগিতার জন্য । সেখানে ফোন করলে কোন এক স্হান থেকে দুইজন যুবক এসে জানালো যে আগেরদিন গভীর রাতে আমি হোটেলে সেল্ফ চেক-ইন করেছি, অনেক সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেছি, রিসিপশন খোলার পরে অফিসিয়ালি ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চ করে সিকিউরিটি এমাউন্ট ব্লক করি নাই ব’লে আমার রুমের কার্ড ব্লক করে দেওয়া হয়েছিলো , কী সাংঘাতিক !

যা হোক, যুবকদ্বয় গভীর রাতে রিসিপশনের অফিস খুলে প্রয়োজনীয় ফরমালিটিজ সম্পন্ন করে আমার রুমের কার্ড আবার একটিভ করে দিলো । ভোর হতে গভীর রাত অবধি বাসে, মেট্রোতে, ফেরিতে, পদব্রজে ১৬-১৭ ঘন্টা জার্নি আর ঘুরাঘুরি করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম । রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে তারপর মধ্যরাতে ডিনার করতে চলে গেলাম সেই আগের রাতের চেনা পথ দিয়ে UBC ক্যাম্পাসের McDonald’s এ, সেখান থেকে এসে আবার ঘুম ।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে এলাম UBC ক্যাম্পাসের মধ্যে সেন্ট্রাল বাস টার্মিনালে যেখানে আমার জন্য পলাশ ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরের তার বাসা থেকে এসে অপেক্ষা করছিলো । দুই বন্ধু মিলে সেখান থেকে বাসে করে প্রথমে গেলাম ভ্যানকুভার ডাউনটাউনে, সেখান থেকে মাঝ-পাল্লার এক বিলাসবহুল ট্রাভেল বাসে চেপে নয়নাভিরাম পাহাড়ি পথ বেয়ে চলে গেলাম বৃটিশ কলাম্বিয়ার অন্যতম পর্যটন গন্তব্য পাহাড়চুড়ার শহর Whistler এ । সেখানে গিয়ে পর্যটন শহরটি ঘুরে দেখলাম, রোপওয়েতে চেপে অনেক উপরে পাহাড়ে গেলাম, ফিরে এলাম, আবার সন্ধ্যায় বাসে চেপে সোজা এসে নামলাম ভ্যানকুভার ডাউনটাউনে । সেখান থেকে আমাকে UBC ক্যাম্পাসমুখী বাসে উঠিয়ে দিয়ে পলাশ চলে গেলো তার বাসার অভিমুখে ভিন্ন একটি বাস/মেট্রো ধরে ।

আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা ছিলো যে, আমি হুইসলার থেকে ভ্যানকুভারের হোটেলে ফিরে এলে সাদিয়া আর ফরহাদ ভাই আমাকে নিয়ে যাবেন তাদের নিকটবর্তী এপার্টমেন্টে, তাদের সাথে ডিনার করবো ব’লে । তারা এলেন, গেলাম তাদের বাসায়, পরিচিত হ’লাম তাদের ছেলের সাথে, ছে’লে ততোদিনে UBC তে ভর্তি হয়েছে, ভীষন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, তবে বেশ চুপচাপ । সাদিয়ার মেয়েটা একটু বড়, সে তখন মেডিকেল/বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে পড়তো টরেন্টো ইউনিভার্সিটিতে ।

আর হ্যাঁ, ছেলে UBC তে ভর্তি হয়েছিলো বলেই সাদিয়া-ফরহাদ ভাই ভ্যানকুভার শহরের উপকন্ঠে তাদের নিজেদের বেশ বড়সড় বাড়ি ছেড়ে ক্যাম্পাসের ভিতরে ছেলেকে নিয়ে থাকার জন্য UBC তেই একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছিলো । ডিনার করলাম সাদিয়ার সাথে । মনে আছে, সাদিয়া সেদিন ফোকাস করেছিলো Salmon -এ ; ওটা দিয়েই রান্না করেছিলো বেশ কয়েকটি সুস্বাদু মেনু, সাথে ছিলো আরও কিছু পদ । ভুড়িভোজ সম্পন্ন হ’লে সাদিয়া আর ফরহাদ ভাই আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেলেন ।

পরেরদিন সকালে তাড়াহুড়ো ছিলো না, আমি ধীরেসুস্থে ঘুম থেকে উঠে কাছেপিঠের আমার একমাত্র খাবারের জায়গা ম্যাগডোনাল্ডস এর পাশে গিয়ে একটা ছোট্ট ইন্ডিয়ান খাবারের আউটলেট খুঁজে পেলাম যেখান থেকে এক প্লেট চিকেনবিরানী কিনে নাস্তার কাজ সেরে ফেললাম । কথা ছিলো, এরপর আমি সুবিশাল UBC ক্যাম্পাসের এদিক-সেদিক ঘুরে-ঘুরে দেখতে থাকবো, আর দুপুরের দিকে পলাশ এসে আমাকে নিয়ে যাবে ভ্যানকুভারের ডাউনটাউনে ।

সত্যিই বিশাল এক নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস UBC এর । চারিদিকে অনেকগুলি সী-বীচ । ঘুরতে ঘুরতে আমি এমন একটা বীচে গিয়ে পৌছালাম যেখানে রাস্তা থেকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কয়েকশো সিড়ি ভেঙ্গে নীচে নেমে বীচের পরিস্হিত দেখে তো আমার চোখ চড়কগাছ ; মনে হচ্ছিলো, সেখানে আমিই বোধহয় সম্পূর্ন অদ্ভূৎ প্রজাতির একমাত্র প্রানী । উল্লেখ্য যে, রাস্তা থেকে নীচের দিকে বীচে নামার সময় একটা সাইনবোর্ড খেয়াল করি নাই যেখানে লেখা ছিলো ” Clothing is optional “. বীচের নামটা আর না-ই বা বললাম, আগ্রহী পাঠক ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই তা খুঁজে পাবেন ।

দুপুরে পলাশ এসে আমাকে UBC ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধার করলো, দুই বন্ধু গেলাম ডাউনটাউনে, সেখান থেকে ফেরিতে চেপে কোন এক বে পার হয়ে ওপারে গিয়ে কিছুক্ষণ থেকে আবার ফিরে এলাম । যে কোন শহরে গেলে প্রাকৃতিক ওয়াটার-বডিতে ফেরিতে/বোটে চেপে ভ্রমন আমি বরাবরই বেশ উপভোগ করি ।

সেদিন দুপুরে কোন এক স্হানীয় বাঙালি কমিউনিটির অনুষ্ঠানে সাদিয়া আর ফরহাদ ভাইয়ের দাওয়াত ছিলো । সেখান থেকে ফেরার পথে ডাউনটাউনের কোন কোন জায়গা থেকে তারা আমাদেরকে পিক করে নিয়ে গেলেন ভ্যানকুভার শহরের মধ্যকার সবচাইতে পপুলার পর্যটন স্হান Stanley Park এ । পলাশ, ফরহাদ ভাই, সাদিয়া আর আমি গাড়িতে চড়ে, কখনো গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে বিশাল Stanley Park এর বিভিন্ন জায়গায় বেড়িয়ে, ছবি তুলে দারুণ এক উপভোগ্য সন্ধ্যা পার করলাম ।

সাদিয়া বাঙালি কমিউনিটির অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলো বলে শাড়ী পড়ে ছিলো ; আমরা যখন স্ট্যানলি পার্কে ঘুরছিলাম তখন দুষ্টুমি করে সে আমাদেরকে বলছিলো যে, আশেপাশের মানুষজন বোধহয় শাড়ি-পরিহিতা তাকে দেখে এলিয়েন ভাবছিলো । সন্ধ্যায় Stanley Park এর একটি জায়গায় আমাদের নামিয়ে দিয়ে সাদিয়া আর ফরহাদ ভাই চলে গেলেন UBC তে । আমাকেও নিয়ে যেতে চাইলেন যেহেতু আমার হোটেলও সেখানেই ; কিন্তু পলাশ বললো, আজকে তার সাথে আমার ভ্যানকুভারের শেষদিন ; তাই আমরা দুই বন্ধু একটু একান্ত আলাপচারিতায় বিদায়ী আড্ডা দিবো ।

ফরহাদ ভাই আর সাদিয়া চলে যাওয়ার পরে আমি আর পলাশ স্ট্যানলি পার্কে অনেকক্ষণ বসে আড্ডা দিলাম, তারপর সেখান থেকে বের হয়ে পার্কের পাশে এক জমজমাট রাস্তায় একটি ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে বসে ডিনার করলাম । ডিনার শেষে আমাকে UBC অভিমুখী বাসে তুলে দিয়ে বিদায় জানালো পলাশ । পুরো তিনটি দিন দুই বন্ধু একসাথে চড়ে বেরিয়েছিলাম বৃটিশ কলাম্বিয়ার বিভিন্ন প্রান্তরে, ভীষণ মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েছিলো বুয়েট পরবর্তী সময়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে দুই বন্ধুর এই মিলনমেলা, চলতে-ফিরতে কতো কতো পুরনো ও চলমান বিষয় নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠেছিলাম আমরা । মায়া বড়ই সাংঘাতিক জিনিস, আমার জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় আমি তা উপলব্ধি করেছি ।

একটি কথা না বললেই না । প্রথম দুইদিন খুব সকালে ভ্যানকুভার থেকে দূরবর্তী স্হান ভিক্টোরিয়া আর হুইসলার এ যেতে হবে ব’লে সকালে ব্রেকফাস্ট করতে কোথাও গেলে দেরি হয়ে যাবে সেটা বিবেচনা করে পলাশ তার ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরের বাসা থেকে কাকডাকা ভোরে রওনা হওয়ার সময় টিফিন ক্যারিয়ারে বেশ কিছু ধরনের খাবার সঙ্গে নিয়ে আসতো ব্যাকপ্যাকে যা আমরা ক্ষুধা নিবারনের জন্য বাসে বসেই খেতে পারি পরবর্তী ফাইনাল ডেসটিনেশনে গিয়ে খাওয়ার জায়গায় বসে শান্তিমতো খাওয়ার আগ পর্যন্ত । যতদিন আমার স্মৃতিশক্তি থাকবে, ততোদিন এই বিষয়টি আমার মনে থাকবে আজীবন ।

এর পরেরদিন সকালে হোটেলে ঘুম থেকে উঠে UBC ক্যাম্পাসে নাস্তা করে, হোটেল থেকে চেকআউট করে, পুরো ক্যাম্পাসের এখানে-সেখানে আরও কিছুটা সময় ঘুরাঘুরি করে, লাঞ্চ করে রওনা দিলাম ভ্যানকুভার এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, পরবর্তী গন্তব্য কানাডার আলবার্টা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ন শহর ক্যালগেরি । এভাবেই শেষ হ’লো আমার ৪ দিন ৫ রাতের বৃটিশ কলাম্বিয়া সফর ।

পাদটীকা :
একটি বিষয় লিখার ইচ্ছে ছিলো না, তবে না লিখলেও কেন যেন আমার এই লেখাটিকে অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছে । বুয়েটের ‘৮৯ ব্যাচের ফরহাদ ভাই ছিলেন আইটি প্রোফেশনাল, আর আমাদের বন্ধু সিভিল ইন্জিনিয়ারি সাদিয়া কাজ করতো ভ্যানকুভার সিটি করপোরেশনে । মেধাবী ছেলে আর মেয়ে দুইজনই ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ছিলো ; দারুন এক আনন্দঘন সময় কাটছিলো তাদের পরিবারে । সাদিয়া, ফরহাদ ভাই দু’জনেই ভীষণ প্রানবন্ত, উচ্ছল মানুষ ।

হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা তাদের পরিবারে বয়ে নিয়ে আসে সুনশান নীরবতা । কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলো সাদিয়া, কোন এক উঁচু জায়গা থেকে হঠাৎ পিছলে পড়ে গিয়ে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ; হাসপাতালে সুদীর্ঘ সময় আইসিইউতে অনেকটা কোমায় থাকতে হয় সাদিয়াকে, আস্তে আস্তে হয়তো কিছুটা রেসপন্স করছে সে খুবই স্লোলি । প্রথমদিকে ফরহাদ ভাইকে হোয়াটসঅ্যাপে/মেসেন্জারে মাঝে মাঝে সাদিয়ার আপডেট জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু একই বিষয় বারবার জিজ্ঞেস করলে উনি কষ্ট পাবেন বলে আর জিজ্ঞেস করি না, ফেসবুকে ফরহাদ ভাইয়ের পোষ্ট দেখে পরিস্হিতি আন্দাজ করি, আপডেট পাওয়ার চেষ্টা করি । পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের বন্ধুকে আবারও সম্পূর্ণ রিকভারি করার তৌফিক দান করেন ।

আনোয়ার পারভেজ শেফীন
চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ