সময়টা বোধহয় ছিলো ২০২২ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ । কোন এক সন্ধ্যায় কানাডার ভ্যানকুভার এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করে রাতে এসে পৌছালাম ক্যালগেরি এয়ারপোর্টে । সেখানে অপেক্ষমান আমার বুয়েটের একই ডিপার্টমেন্টের ক্লাসমেট ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারেক আমাকে পিক করে নিয়ে গেলো আমার হোটেলে । অফিসিয়ালি হোটেলে চেক-ইন করে রুমের এন্ট্রিকার্ড হাতে নিয়ে রিসিপশনেই লাগেজ রেখে আমরা রওনা দিলাম একটি বাংলাদেশি রেষ্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে ডিনার করার জন্য । রেষ্টুরেন্টটির নাম ছিলো “উৎসব” । সেখানে বাংলাদেশি খাবারের কয়েকটি মুখরোচক মেনু দিয়ে উদরপূর্তি করে ঢেকুর তুলতে তুলতে আমরা গভীর রাতেই ছুটলাম ক্যালগেরি ডাউনটাউনের উদ্দেশ্যে, প্রথম রাতেই তারেক আমাকে গভীর রাতের অন্ধকারে অনেকটা মানবশূন্য আলো-ঝলমল ক্যালগেরি ডাউনটাউনের ভাইবস্ দেখাবে ব’লে । বেশ কয়েকটা জায়গায় থামলাম, গাড়ি থেকে নামলাম, ফটো তুললাম, তারপরে হোটেলে আমাকে নামিয়ে বিদায় নিলো তারেক । এরপর হোটেলের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে দিনশেষের ক্লান্তি-ঘুম ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খুবই হাল্কা কিছু নাস্তা পেলাম হোটেলের লবিতে । অন্যান্য হোটেলে যেমন বুফেতে ব্রেকফাস্ট সার্ভ করা থাকে, এখানে তেমনটা ছিলো না যদিও সেটি ছিলো বিখ্যাত গ্লোবাল চেইনের একটি স্বনামধন্য ফাইভস্টার হোটেল । লবির এক পাশ দিয়ে কিছু প্যাকেটজাত ড্রিংকস্, কিছু কেক, কিছু ফলমুল সাজানো ছিলো, সেখান থেকে যার যেটা দরকার তা নিয়ে রুমে চলে যাচ্ছে । ব্রেকফাস্টের এরকম সিস্টেম আমি আগে কোথাও দেখিনি কখনো ; মনেমনে হোটেল কর্তৃপক্ষকে ছোটলোক বলে গালি দিলাম । এরপর রুমে গিয়ে রেডি হলাম বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ।
বুয়েটের আমার ডিপার্টমেন্টের আর একজন অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারেক হোটেলের লবিতে এসে আমাকে ফোন দিলো । প্রসঙ্গত ব’লে রাখি, এই তারেক আর আগের রাতের তারেক কিন্তু একই ব্যক্তি নয় ; এটা হ’লো তমাল তারেক । দুই তারেকই আমার একই ডিপার্টমেন্টের একই সেকশনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ; আরেকটি মিল আছে তাদের পরিবারে, উভয়ের সহধর্মিণীই পেশায় চিকিৎসক ।
যা হোক, তমাল তারেক আমাকে প্রথমে নিয়ে গেলো পথিমধ্যে কানাডার ফার্স্টফুডের চেইনশপ Tim Horton’s এ সকালের নাস্তা করার জন্য । টেক-এ্যাওয়ে প্যাকেটে নাস্তা আর কফি নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম ; আমাদের গন্তব্য পাহাড়ের অনেক উপরে আলবার্টার অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত পর্যটন শহর ব্যানফ্ (Banff) ।
ক্যালগেরিতে আসার আগে ভ্যানকুভার থেকে যেদিন বৃটিশ কলাম্বিয়ার পাহাড়ের উপরের পর্যটন শহর হুইসলারে যাচ্ছিলাম বুয়েটের বন্ধু পলাশের সাথে, তখন পলাশ আমাকে অনেকটা চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলে রেখেছিলো যে, হুইসলার দেখলে আর ব্যানফ্ উপভোগ করবার কোন আবেদনই বাকি থাকার কথা নয়, তারপরও আমি চাইলে আমার পর্যটনের তৃষ্ণা মেটাতেই পারি ।
যা হোক, গাড়িতে বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আর দু’জনের মাথায় দীর্ঘদিনের জমানো ঘুটিনাটি সব বিষয় আলাপ করতে করতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে রকি পর্বতমালার সুউচ্চ জাদুকরি সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বন্ধু তমাল তারেকের সাথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ব্যানফ অভিমুখে, সে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি ! সব পথই এক পর্যায়ে গিয়ে শেষ হয় তা সে কুৎসিত কিংবা নয়নাভিরাম যাই হোক না কেন । তবে এমন মনভোলানো পাগলপারা পথ দ্রুত শেষ হ’লে আফসোস লাগে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটির কথা মনে পড়ে – “কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে” ; যা হোক আমরা দ্রুতই পৌঁছে গেলাম ব্যানফ্ -এ ।
সেখানে গাড়ি পার্কিং করে আমরা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌছালাম লেক লুইসের পাড়ে । লেক লুইসের পানি তখনো জমে সম্পূর্ন বরফে পরিনত হওয়ার মতো শীত পড়েনি, তবে তীব্র শীতের কনকনে বাতাস ছিলো, আর বোধহয় ছিলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ঝাপটা । আমাদের হাতে ছাতা ছিলো, তবে মনে আছে যে লেকের পাড়ে ছাতা রেখে ছবি তোলার সময় সেই ছাতা বাতাসে উড়ে লেকের পানিতে পড়তে গিয়েছিলে আমরা দৌড়ে গিয়ে তাকে পাকড়াও না করলে ।
লেক লুইসের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য আমাকে কতোটা বিমোহিত করেছিলো তা যদি এখানে শব্দবন্দী করতে চাই, তাহলে তা রীতিমতো অন্যায় হবে ; কারন, চোখে দেখা সকল সৌন্দর্যের অনুভূতি শব্দবন্দী করার চেষ্টা কখনো কখনো কেবল দুঃসাধ্য নয়, বরং কিছুটা অপরাধ বলেই আমার মনে হয় । দু-চোখ ভরে লেক লুইসের সৌন্দর্য্য উপভোগ করে আমরা ফিরে এলাম ব্যানফ্ এর মূল টাউন এরিয়ায় । সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম, তারপর ব্যানফ্ এর একটি ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে দুই বন্ধু বসে লাঞ্চ করলাম, এরপর আরও কিছুটা সময় ব্যানফ শহরে ঘুরাঘুরি করে আবার ফিরতি পথে রওনা দিলাম ক্যালগেরির উদ্দেশ্যে । তবে ফেরার পথে তমাল অন্য রাস্তা ধরেছিলো যেখানে বেশ কিছুটা পথ একদিকে ছিলো পাহাড়, আরেকদিকে নয়নাভিরাম লেক ।
রকি পর্বতমালার মাঝে লেকের পাশ দিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে নামতে নামতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যালগেরিতে তমালের বাসায় । সেখানে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে তমালের ফ্যামিলিসহ আমরা রওনা দিলাম ক্যালগেরির আরেকটি লোকালয়ে আমাদের বন্ধু তানিয়ার বাসায় ডিনারের আমন্ত্রণে যোগ দিতে । প্রসঙ্গত ব’লে রাখি, তানিয়া ছিলো বুয়েটে আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমাদের ব্যাচের ফার্স্টগার্ল । তানিয়ার বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে পরিচয় হ’লো, সৌভাগ্যক্রমে আরও দেখা হ’লো আংকেল ও আন্টি অর্থাৎ তানিয়ার আব্বা-আম্মার সাথে ; কারন, উনারা সেসময় ক্যালগেরিতে তানিয়াদের সঙ্গেই ছিলেন ।
ডিনারের টেবিলে বিভিন্ন পদের সুস্বাদু সব খাবারের আয়োজন দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে এর পেছনের অন্যতম কারিগর আমাদের শ্রদ্ধেয়া আন্টি । আর হ্যাঁ, আরেকটি কথা না বললেই নয়, আর তা হ’লো আংকেল নিজেও একজন বুয়েটিয়ান যিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে পাওয়ার সেক্টরে কাজ করেছেন এবং সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়েছিলেন একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ।
আমি যেহেতু পাওয়ার সেক্টরের কাজের স্কোপ সম্বলিত ইন্ডাস্ট্রিতে এন্ট্রিপ্রিনিয়র হিসেবে কাজ করি ; তাই উনার কাছ থেকে আমি উনার বর্নাঢ্য সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অনেক অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারলাম । আংকেলও খুবই আগ্রহের সাথে জানতে চাইলেন আমরা কোন কোন কাজের স্কোপকে ফোকাস করে কাজ করছি । তানিয়ার বাসায় সুস্বাদু ডিনার আর পাশাপাশি তমাল ও তানিয়া দুইজনের পরিবারের সদস্যদের সাথে গপ্পোসপ্পো করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা অনেকটা গড়িয়ে গভীর রাত হয়ে গেছে তা বুঝতেই পারি নাই । শেষ পর্যন্ত তানিয়ার পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম । আমাকে আমার হোটেলে নামিয়ে দিয়ে তমাল চলে গেলো তার বাসায় । দীর্ঘদিনেে বিরতিতে প্রিয় বন্ধুদের সাথে এমন একটি স্মৃতিময় দিনের মুহুর্তগুলি এভাবে দ্রুত শেষ করে বিদায়বেলায় মনটা উদাস হয়ে যায়, কেমন জানি ফাঁকাফাঁকা লাগে – এরই নাম মায়া ।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে একটু রিল্যাক্সে আস্তে-ধীরে লাগেজ গুছিয়ে হোটেল থেকে চেকআউট করে রওনা দিলাম ক্যালগেরি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে । পরবর্তী গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ; তবে নেমেছিলাম নিউজার্সির নিউইয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে, সেবারে উঠেওছিলাম নিউজার্সিরই একটি হোটেলে । ওইবারই প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিলো যে, কানাডার কোন এয়ারপোর্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাই করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট কানাডার এয়ারপোর্টে উপস্হিত থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে ফেলে । এভাবেই শেষ হ’লো আমার কানাডার আলবার্টা সফর ।
তবে বৃটিশ কলাম্বিয়ার হুইসলার, না-কি আলবার্টার ব্যানফ্ – এই দুইটি দর্শনীয় স্হানের মধ্যে কোনটি সৌন্দর্যের বিচারে এগিয়ে রয়েছে সেই উপসংহারে আমি যাবো না মূলতঃ দু’টি কারনে । প্রথমটি হ’লো দু’টির সৌন্দর্য দুই রকম যার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা সমীচীন হবে না ; অন্য কারনটি হ’লো, দুইটি জায়গা কানাডার দু’টি রাজ্যে আমার দুই অতি প্রিয় বন্ধু অনেক কষ্ট করে আগ্রহ সহকারে তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে আমাকে উপভোগ করবার সুযোগ করে দিয়েছে । তাই তুলনামূলক সৌন্দর্য বিচারের চেষ্টা ভুলক্রমে বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার যে কোন একজন বন্ধুর মনে বেদনার ছাপ ফেলতে পারে যা কি-না আমি কোনভাবেই করতে পারি না ।
আনোয়ার পারভেজ শেফীন
চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ

