Blog

১২ ডিসেম্বর, ২০২৩ রাত ১১:৪৫ মিনিটে জাপান যাত্রার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইটে ছিল আমার টিকিট। যথাসময়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে আমেরিকান এক্সপ্রেসের প্লাটিনাম লাউঞ্জে রিল্যাক্সের সাথে এটা-সেটা খাচ্ছি, আর মোবাইলে বিভিন্ন বিজনেস কমিউনিকেশনের কাজ করছি।

 

রাত ১১:১৫ বেজে যায়, কিন্তু ডিসপ্লে বোর্ডে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট শিডিউলের কোনো ইনফরমেশনই শো করে না, এমনকি ফ্লাইট ডিলেইড কি-না তাও দেখায় না; টেনশনে পড়ে গেলাম। Amex Platinum Lounge এর ফ্রন্টডেস্কে ওইসময় ডিউটিরত সুদর্শন স্যুট-টাই পরা ওভারস্মার্ট পোলাপানদেরকে জিজ্ঞেস করলাম; ওরাও কিছুই বলতে পারে না। অন্যভাবে চেক করা যায় কি-না তা আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল যে, ডিসপ্লে বোর্ডের ইনফরমেশনের বাহিরে তারা কিছুই বলতে পারে না।

 

আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে তারা বলল যে, স্যার, ডিসপ্লে বোর্ডে দেখানোর পাশাপাশি বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা কোনো প্যাসেঞ্জার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্লাইটের বোর্ডিং লাইনে না গেলে তারা প্যাসেঞ্জারের নাম ও ফ্লাইট উল্লেখ করে মাইকে অ্যানাউন্স করে এবং ফিজিক্যালি এসে বিভিন্ন লাউঞ্জগুলোতে খুঁজতে থাকে। তাদের কথা সত্য, আমি নিজেও এটা দেখেছি বিভিন্ন সময়। তাই তারা আমাকে টেনশন না করে রিল্যাক্সে লাউঞ্জেই সময় কাটাতে বলল।

 

কিন্তু এই ভৌতিক ঘটনার কারণে আমার দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকল। বুড়ো বয়সে নিজের পরিশ্রম কমানোর জন্য আমার অফিসের অ্যাডমিন ও লজিস্টিক ম্যানেজারকে আমি ফোন করে বাংলাদেশ বিমানের ওয়েবসাইট চেক করে জানাতে বললাম। সে চেক করে আমাকে জানাল যে, ফ্লাইট শিডিউল অনটাইমে আছে এবং ১ নম্বর গেটে বোর্ডিং হচ্ছে। তখন আমি ডিসপ্লে বোর্ডে দেখানো ইনফরমেশন উপেক্ষা করে এবং অ্যামেক্স লাউঞ্জে তখন দায়িত্বরত ম্যানেজারের আশ্বাসবাণীর ওপর পূর্ণ আস্থা না রেখে নিচে গিয়ে ক্যারি-অন লাগেজ নিয়েই পাগলের মতো ১ নম্বর গেটের দিকে দৌড়াতে থাকলাম।

 

কারণ, তখন বাজে রাত ১১:৪০। ফ্লাইট শিডিউল ঠিক থাকলে তখন আমার পক্ষে আর ফ্লাইট ধরা সম্ভব না, তবুও শেষ চেষ্টা করতে তো দোষের কিছু নাই। আমাকে দৌড়াতে দেখে বিমানবন্দরের একজন কর্মী কয়, ‘দৌড়ান কেন?’। আমি কাহিনি খুলে বললে সে আমাকে বলল যে, মনে হয় উল্টোদিকের শেষ প্রান্তের কাছাকাছি ৯ নম্বর গেটে নারিতার বোর্ডিং চলছে। আমি আবার উল্টোপথে ভোঁ-দৌড় দিতে শুরু করলাম।

 

গেটের নম্বর দেখার টাইম নাই। যে গেটেই কিউ দেখি সেখানকার লাইনে দাঁড়ানো কিউট-কিউট ভাইয়া আর আফাগো জিগাই যে, ‘এটা কি জাপানের নারিতার ফ্লাইটের বোর্ডিং লাইন?’। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে শেষ পর্যন্ত সঠিক গেটের সন্ধান পেয়ে গেলাম।

 

এতটুকু পড়ে আমাকে ইতোমধ্যেই অর্বাচীন মনে করা বিজ্ঞজনদের বিবেচনার জন্য বলে রাখি যে, পুরো বিমানবন্দরের কোনো ডিসপ্লে বোর্ডেই বিমানের নারিতার ফ্লাইটের কোনো ইনফরমেশন ছিল না; এমনকি মাইকেও কেউ কোনো কিছু অ্যানাউন্স করছিল না। আমার সৌভাগ্য, ততক্ষণেও বোর্ডিং গেট বন্ধ করে দেয় নাই। এমন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম। কারণ, যে কোনো কারণেই ফ্লাইট ডিলেইড হতেই পারে, তবে সেক্ষেত্রে ডিসপ্লে বোর্ডে সেই ইনফরমেশনটা অবশ্যই থাকবে।

 

ফ্লাইট শিডিউলে বিপর্যয় পৃথিবীর সকল দেশের সকল এয়ারপোর্টেই বিভিন্ন সময় কমবেশি ঘটে, এটা নতুন কিছু নয়। আমেরিকার অনেক বিখ্যাত এয়ারপোর্টে বিখ্যাত এয়ালাইন্সের ক্ষেত্রেও আমি এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছি; তবে তার যথাযথ ইনফরমেশন ডিসপ্লে বোর্ডে থাকে। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঐদিন আমার ফেইস করা ঘটনা অন্য কোথাও ঘটে কি-না তা আমার জানা নেই। এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলতেই হবে, অঘটন ঘটনপটিয়সী হিসেবে আমরাই সেরা; কাস্টমাইজড ঘটনার জন্ম আমরাই দিতে পারি সকল ক্ষেত্রেই। অবশ্য এটাও কিন্তু একটা জাতির সিগনেচার স্টাইল হতেই পারে।

 

এই যেমন পৃথিবীর আর কোনো জাতি কিন্তু পাকিস্তানের মতো একটি আধুনিক সুসজ্জিত ওয়েলট্রেইন্ড সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর বিশাল রাজাকার-আলবদর-আলশাসমস্ বাহিনীর মতো ঘর ও বাহিরের সম্মিলিত শত্রুর সাথে মাত্র ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি কারফিউ অমান্য করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নিজের মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করবার ইতিহাসও এই পৃথিবীতে কেবল বাঙালি জাতিরই আছে; তাই তো একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

 

আবার ১০০ বছরের বৈশ্বিক ইতিহাসের ভয়াবহতম কোভিড প্যান্ডেমিকে পৃথিবীর মহাপরাক্রমশালী দেশগুলো যখন কুপোকাত হতে চলেছিল, তখনও পৃথিবীর সবচাইতে বেশি জনঘনত্বের এই ছোট্ট গরিব দেশেও আমরা সরকারি লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কোথাও নেতা বা সেলিব্রেটির রাজনৈতিক শোডাউনে কিংবা জানাজায় আর কোথাও বিভিন্ন সামাজিক ইভেন্টে লক্ষ বা হাজার মানুষ মাস্ক ছাড়াই ধাক্কাধাক্কি করে একত্রিত হয়েও কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে, ‘আমি মানি না কো কোনো আইন, আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!’। কিন্তু তাতেও কোভিড আমাদের খুব একটা কাবু করতে পারে নাই; কোভিডজনিত অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিও আমরা অল্প সময়েই কাটিয়ে উঠেছি।

 

তাই বলি, আমরা কিন্তু আসলেই খুবই কিউট জাতি। কারণ, সে রাতে দেখলাম, আমার মতো বিমানের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইটের অন্য সকল প্যাসেঞ্জারও কিন্তু কোনো না কোনোভাবে রবাহূত হয়ে ঠিকই সঠিক বোর্ডিং গেটে সময়মতো পৌঁছে গিয়ে আমার আগেই যথাসময়ে বোর্ডিং সম্পন্ন করে এয়ারক্রাফটে উঠে যার যার সিটে কিউট নরনারীর মতো সুন্দর করে বসে পড়েছিল; আমিই ছিলাম ঐ ফ্লাইটে বোর্ডিং করা সর্বশেষ বেকুব।

 

এটা কি বাংলাদেশের বিমানযাত্রীদের এক প্রকারের ওভার কনশাচনেস ও স্মার্টনেস নয়? কারণ, অন্য কোনো জাতি হলে ডিসপ্লে বোর্ডে ঐ ফ্লাইটের ইনফরমেশন না আসা পর্যন্ত চুপচাপ কোথাও বসে থাকত; আর এরই মধ্যে বিমান তাদেরকে না নিয়েই উড়াল দিয়ে পালিয়ে যেত।

 

সত্যিই আমরা পারি, যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো কিছুর মোকাবিলায়, যখন যেখানে যেমনটি প্রয়োজন।

 

It’s not bad!!!!