Blog

জীবনে চলার পথে পেশাগত কাজে বা নিছক বেড়ানোর জন্য কিংবা ‘রথ দেখা কলা বেচা’ একসাথে চালিয়ে এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার অনেক জায়গাতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রতিটি জায়গাতেই লক্ষ করেছি অ্যাকাডেমিক, পেশাগত ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন রকমের কার্যক্রমের জন্য আগত বিদেশি মানুষজনকে বিস্তৃত বা সীমিত পরিসরে সেদেশের ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশনের প্রতি আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সেদেশের পর্যটন শিল্পকে বিভিন্ন উপকরণ ও সেবার মাধ্যমে বিকশিত ও সুসজ্জিত করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে বা বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদেরকে বা অন্য পেশাগত কাজে এদেশে আগত মানুষজনদেরকে তাদের পেশাগত কাজের ফাঁকে পর্যটনের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশেষ উদ্যোগ আমার চোখে পড়েনি; এমনকি সাইটসীয়িংয়ের জন্য কোনো জায়গায় বিদেশি পর্যটকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিও আমার তেমন একটা নজরে আসেনি।

 

অথচ আশপাশের অনেক দেশের চাইতে বিদেশি ট্যুরিস্টদেরকে আকৃষ্ট করার মতো অনেক বেশি ট্যুরিস্ট স্পট আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশেই আছে; এমনকি এই ঢাকা শহর ও এর আশপাশেও আছে।

 

নেপাল পর্যটনশিল্প থেকে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে যা আমরা অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি। অথচ আমি ২০০৮ সালে যখন সস্ত্রীক নেপাল গিয়েছিলাম তখন দেখলাম কাঠমান্ডু শহরে দেখার মতো তেমন কিছুই নেই। সিটি ট্যুরের নামে তারা শহরের মাঝখানে একটা পুরনো শহরের মতো জায়গায় নিয়ে যায়, আর সেখান থেকে নিয়ে যায় পাহাড়ের ওপরের একটা স্বর্ণমন্দিরে। ব্যস, কাঠমান্ডু শহর দেখা শেষ। পোখাড়া কিন্তু কাঠমান্ডু থেকে অনেক দূরের শহর যেখানে বাসে করে যেতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ ঢাকা থেকে ৬-৭ ঘণ্টা ড্রাইভ করলে প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত নয়নাভিরাম পাহাড়/সমুদ্র/বনাঞ্চল আমাদের দেশেও আছে।

 

এখন আসি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর সিটি ট্যুরের বিষয়ে। কুয়ালালামপুর সিটি ট্যুর বলতে তারা নিয়ে যাবে একটা মিউজিয়ামে যেটা ঢাকার মিউজিয়ামের চাইতে অনেক ছোট। তারপর নিয়ে যাবে তাদের জাতীয় মসজিদ দেখাতে যেটিও কি-না আমাদের বায়তুল মোকাররমের চাইতে ছোট।

 

তারপর চকোলেট ফ্যাক্টরির নাম করে একটা চকোলেটের দোকানে নিয়ে যায় চকোলেট কেনানোর জন্য যেটা কিন্তু মোটেও খুব বড় কোনো আউটলেট নয়। আর নিয়ে যায় মালয়েশিয়ার রাজার বাড়ি দেখাতে। মালয়েশিয়ার রাজার বাড়িটা অবশ্য বেশ সুন্দর। কুয়ালালামপুর সিটি ট্যুরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শহরের প্রাণকেন্দ্রে টুইন টাওয়ার এবং এর আশপাশে ঘুরাঘুরি। তাদের নতুন রাজধানী পুত্রজায়া ট্রিপ কিংবা গেন্টিং হাইল্যান্ড ট্রিপ কিন্তু সিটি ট্যুরের অংশ নয়।

 

এমনকি পশ্চিমা বিশ্ব তথা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বড় দেশ কানাডার সর্ববৃহৎ শহর টরন্টোতেও কিন্তু ট্যুরিস্টদের ভিজিট উপযোগী একটি স্পটও নেই। যারা সেখানে থাকেন বা গেছেন তারা খুব ভালো করেই জানেন এটা।

 

এখন আসি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কথায়। অনায়াসেই এখানে বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনেকগুলো সাইটসীয়িংয়ের ব্যবস্থা করা যায় তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য; কিন্তু তেমন উদ্যোগ দেখি না। বিদেশিরা কোনো বিজনেস ট্রিপে আসলেও আমরা মনে করি গার্মেন্টস পণ্য, লেদার প্রোডাক্টস-সহ আর দুই-তিনটি প্রোডাক্টস এবং ম্যানপাওয়ার রপ্তানি করার জন্য তাদেরকে আকৃষ্ট করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। বিজনেস ট্রিপে বিদেশিরা যখন আসে তখন তাদের হাতেও একদিন বা এক বেলা অবসর সময় থাকে। যথাযথ মার্কেট প্রোমোশনের মাধ্যমে তাদেরকে সিটিট্যুরে আকৃষ্ট করা সম্ভব যার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া যায় যেভাবে অন্য দেশের আবাসিক হোটেলগুলো সেই দেশের ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশনের ওপর বিভিন্ন ধরনের ইনফরমেশন, ফটো আর প্যাকেজ ট্যুরের অফার সম্বলিত লিফলেট হোটেলের রিসিপশনের পাশেই রেখে দেয়। কোথাও কোথাও আবার হোটেলের লবিতে পর্যটনের জন্য নির্ধারিত একটি ডেস্কে ডেডিকেটেডলি একজন মানুষও বসে থাকে আগ্রহীদের সহায়তা করার জন্য।

 

আর এর পাশাপাশি ‘Visit Bangladesh’ টাইপের কোনো এগ্রেসিভ প্রোমোশনাল কার্যক্রমের মাধ্যমেও কেবল ট্যুরিজমের জন্যও বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করা সম্ভব বলেও আমি মনে করি। এ জন্য বাংলাদেশের পর্যটন কর্পোরেশন এবং তাদের সাথে সমন্বয় করে অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন অফিসার ডেডিকেটেডলি কাজ করতে পারে।

 

শুধু ঢাকা শহর ও এর আশপাশেই নিম্নল্লিখিত স্পটগুলোর ওপরে কমপক্ষে দুই-দিনের সাইটসীয়িং ট্যুর বানানো যায় যা কাঠমান্ডু বা কুয়ালালামপুর এমনকি ব্যাংককের সাইটসীয়িং সিটি-ট্যুরের চাইতে সমৃদ্ধ হতে পারে:

১. লালবাগ কেল্লা, ২. আহসান মনজিল, ৩. শহিদ মিনার (যেহেতু ২১শে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), ৪. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, ৫. জাতীয় সংসদ ভবন (এত বিশাল এবং দৃষ্টিনন্দন সংসদ ভবন পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আমার চোখে পড়েনি), ৬. বঙ্গভবন (যেহেতু অধিকাংশ দেশেই রাষ্ট্রপতি/রাজা/রানির কার্যালয় তথা বাসভবনের বাহ্যিক দর্শন তারা সিটি-ট্যুরের মধ্যে রাখে), ৭. রায়েরবাজার বধ্যভূমি, ৮. জাতীয় জাদুঘর, ৯. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ১০. সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ১১. সোনারগাঁও, পানাম নগর, ১২. হাতিরঝিলে আধাঘণ্টার একটা বোট-ট্রিপ, ১৩. ঢাকা চিড়িয়াখানা, ১৪. বোটানিক্যাল গার্ডেন ইত্যাদি।

 

এতক্ষণ আমি কেবল সে-সকল ব্যস্ত ফরেইনারদের কথা বিবেচনা করে বললাম যারা স্বল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে কোনো কাজে আসে। কিন্তু যারা কেবল ট্যুরিস্ট হিসেবেই বাংলাদেশে আসবে তাদের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণ, কক্সবাজার ভ্রমণ, পতেঙ্গা বিচ, সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ, বান্দরবান-রাঙামাটি-কাপ্তাই-সাজেক ট্যুরসহ পর্যটকদের ইন্টারেস্ট বুঝে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত অন্যান্য ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশনের দিকেও তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করা যায়। যেমন, বগুড়ার মহাস্থানগড় ও বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, কুমিল্লার ময়নামতি, শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি, নাটোরের মহারাজার বাড়ি তথা উত্তরা গণভবন ও রানিভবানির প্রাসাদ, পুঠিয়ার রাজবাড়ি, টাঙ্গাইলের রাজবাড়ি, রংপুরের তাজহাটের রাজবাড়ি, মিরেশ্বরাই মহামায়া লেক, চট্টগ্রামের ফয়েজ লেক ও ওয়ার্ল্ড ওয়্যার সিমেট্রি, সিলেটের জাফলং, সাদাপাথর, চলনবিল কিংবা কিশোরগঞ্জ-সুনামগঞ্জের হাওড়ে বোট-ট্রিপ, আধ্যাত্মিক মানুষজনের জন্য কুষ্টিয়ার লালনশাহের মাজার, সিলেটের শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামির মাজার, বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার, সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জের চা-বাগান, ফলের মৌসুমে রাজশাহীর আমবাগান কিংবা দিনাজপুরের লিচুবাগান। এছাড়াও আরও অনেক দর্শনীয় জায়গা আছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।

 

তবে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে এবং সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোর অধিবাসীদের আতিথেয়তামূলক আচরণের মাধ্যমে। কারণ, সামাজিক ও আঞ্চলিক আতিথেয়তা এবং নিরাপত্তাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় পর্যটকদের কাছে পর্যটন গন্তব্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

 

কিন্তু এই ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট অর্থাৎ পর্যটন কর্পোরেশনের এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ ও ফলপ্রসূ প্রচারণা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আন্তরিক তাগিদ আমি কখনো কোনোদিন দেখি নাই।

 

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাজমেন্ট করতে গিয়ে বিটিভির ভিআইপি গেস্টরুমে বসে আমার কথা হচ্ছিল তৎকালীন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক ভদ্রলোকের সাথে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমি কোনো ভিআইপি নই, কিন্তু অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিচারকদের জন্য অডিটোরিয়ামে প্রতিযোগিতা শুরুর আগ পর্যন্ত বিটিভির ভিআইপি গেস্টরুমে বসে অপেক্ষা করার রেওয়াজ চালু আছে।

 

আমি অনেকটা সরাসরিই উনাকে বললাম, ‘আপনাদের পর্যটন কর্পোরেশনে কর্মরত কয়েক হাজার লোকের বেতন-বোনাস-গাড়ি-বাড়ি-পেনশন ও অন্যান্য সুবিধাদির জন্য রাষ্ট্রের যে পরিমাণ অর্থ অপচয় হয় সেখান থেকে দেশ তো শূন্য পরিমাণ কোনো আউটপুটও পায় না; এই খাতে সরকারি ব্যয়ের পুরোটাই তো লস!’।

 

বেচারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য আমাকে বললেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বার, ডিস্কো-ড্যান্স আয়োজনকারী নাইটক্লাব, ক্যাসিনো, স্পা-সহ আরও অনেক কিছুর আয়োজন থাকতে হবে, সমুদ্রসৈকতে শর্টকাট বিচওয়্যার পড়ে বিদেশি পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যে অবসর উপভোগের পরিবেশ থাকতে হবে যেমনটা আছে আশপাশের পর্যটনবান্ধব দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, দুবাই কিংবা নেপালে।

 

তবে এটা ঠিক যে, কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের তো সূর্যাস্তের পর হোটেলের রুমের মধ্যে নাক ডাকিয়ে ঘুমানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই। না আছে কোনো সান্ধ্যকালীন বিচ অ্যাক্টিভিটিজ, না আছে বাচ্চাদের বা বড়দের জন্য ভালো মানের কোনো এমিউজমেন্ট পার্ক/ক্লাব, না আছে কোনো থিয়েটার দেখার হলরুম বা মঞ্চ, না আছে কোনো ভালো মানের পাবলিক সিনেপ্লেক্স।

 

তাই, আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আর তথাকথিত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবিদের সভা-সেমিনারে পর্যটনশিল্প বিষয়ে কেবল বুলি আওড়ানো বাদ দিয়ে পর্যটন শিল্পকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করার জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং যত দ্রুত সম্ভব সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি। তাহলে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করা সম্ভব যেখান থেকে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যেতে পারে কেবলমাত্র যে ধরনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই নেপাল, মালদ্বীপসহ পৃথিবীর অনেক দেশ টিকে আছে।

 

অনেকে হয়তো বলতেই পারেন, তাহলে আমি বুলি আওড়াচ্ছি কেন? কারণ, আমি রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মতো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে নেই, অর্থাৎ আমার হাতে এমন কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা নাই যা আমি এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পারি। কাজেই, আমি বাংলাদেশের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মতামতই কেবল উপস্থাপন করতে পারি।