Blog

১৯৯৪ সালের জুন মাসে “আমরা ‘৯২” ব্যাচের ক্লাস যখন শুরু হ’লো, বুয়েটে তখন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক (DSW) ছিলেন ডঃ কারনী স্যার, উনি মেটালার্জিকাল ইন্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ছিলেন । ছাত্রছাত্রী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ইভেন্টে, এক্সট্রাকারিকুলার একটিভিটিজে, বিভিন্ন ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতায় বুয়েটে DSW ইনভল্বড্ থাকেন ব’লে ক্যাম্পাসে ভাইস চ্যান্সেলরের পরেই DSW সবার কাছে আলোচিত, সমালোচিত থাকেন (উল্লেখ্য যে, আমাদের সময় প্রোভিসি পদবীটি ছিলো না) । শুরুর দিকে আমরা সে কারনেই কারনী স্যারকে চিনেছি । কারনী স্যারও একটিভ ডিএসডব্লিউ ছিলেন ; কিন্তু যেহেতু আজ বসুনিয়া স্যারকে নিয়ে লিখবো, তাই কারনী স্যারকে নিয়ে আর ডিটেইলসে যাচ্ছি না ।

আমাদের বুয়েট লাইফের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে বোধহয় DSW হ’লেন সিভিল ইন্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রোফেসর ডঃ শামীম জেড বসুনিয়া স্যার ; শুরু হ’লো তাঁর অধ্যায় । ক্যাম্পাসে পোলাপানদের সাথে বন্ধুর মত মিশে যাওয়া, কখনোবা চিল্লায়ে ঝাড়ি দেওয়া, কখনো দুষ্টামি/কিডিং করা, কখনো ফান করা এমন ডিএসডব্লিউ অন্য কোন সময় ছিলো কি-না আমি জানি না ।

আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্ট ছিলাম ; তাই ক্লাসরুমে তো স্যারকে পাই নাই, দেখার সুযোগ হয় নাই যে উনি কেমন পড়ান । তাই জানার কৌতুহল হ’লো । সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ের বন্ধুদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, বসুনিয়া স্যার তো ক্যাম্পাসে দেখা হ’লে অধিকাংশ সময় আমাদের সাথে ফান করেন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পগুজব করেন ; ক্লাসেও কি উনি শুধু ফান করে, গল্পগুজব করেই পুরো সময় কাটিয়ে দেন না-কি ?

তারা বললো, আমার ধারনা আংশিক সত্য অর্থাৎ ক্লাসেও উনি ব্যাপক ফান করেন । ক্লাসের ৫০ মিনিট সময়ের মধ্যে ২৫ মিনিট আসলেই উনি ফান করেন, বাকি ২৫ মিনিটে যা পড়ান তা এমনভাবে পড়ান যে একেবারে মনের মধ্যে গেঁথে যায়, কনসেপ্ট ক্লীয়ার হয়ে যায় । তাদের ভাষ্য ছিলো এরকম, পড়ানোর মত পড়ালে ২৫ মিনিটই যথেষ্ট ; ৫০ মিনিট ধরে মনোটোনাসলি ঘ্যানরঘ্যানর না করলেও চলে । এতে সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্ট না হয়েও বুঝলাম, ক্লাসটিচার হিসেবেও উনি বেশ জনপ্রিয় ।

একবার পোলাপান অটো ডিকলিয়ার করেছে ; কিছু পোলাপান সকালে মেইন গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আঁতেল টাইপের কারা কারা ক্লাস করতে চায় তাদেরকে দেখার জন্য, চিনে রাখার জন্য । বসুনিয়া স্যারও যথারীতি অবস্থান নিয়েছেন মেইন গেটের সামনে । কেউ একজন মনে হয় ক্লাসে যাওয়া আঁতেলদেরকে অথবা স্যারের পাহারাদারীর দায়িত্ব নিয়ে পেছন থেকে কোন একটা কটুক্তি করেছে ; আর যাবে কৈ ? স্যার দিলেন তারে দৌড়ানি । বসুনিয়া স্যারের দৌড়ানি খেয়ে সে সুপারসনিক স্পীডে ভোঁ-দৌড় দিলো পলাশীর দিকে । সে এক দেখার মত দৃশ্য !

এমনও হয়েছে, আমরা পলাশীতে গিয়েছি বিকেলে/সন্ধ্যায়, হঠাৎ বসুনিয়া স্যারের সাথে দেখা সেখানে, স্যারকে বললাম আইসক্রিম খাওয়াতে হবে ; স্যার মোড়ের ওই দোকানদারকে বললেন সবাইকে আইসক্রিম দেওয়ার জন্য ।

আমাদের সময় বুয়েটে ৬-টি ব্যাচে সবগুলি ডিপার্টমেন্টের সবগুলি সেকশন মিলিয়ে ১২০-১৫০ জন কমিশন্ড আর্মি/নেভী অফিসার পড়তেন । বুয়েট থেকে পাস করার বেশ কয়েক বছর পরে তাদের কয়েকজনের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম, বুয়েটের স্মৃতিচারন করছিলাম । তাদের একজন বললেন, একদিন সকালে ক্লাস শুরুর আগ দিয়ে ইএমই বিল্ডিং আর সিভিল বিল্ডিংয়ের মাঝখানের রাস্তায় গাড়ির যত্রতত্র পার্কিং আর ওভারটেকিংয়ের অব্যবস্হাপনায় ভীষণ জট লেগে গেছে, সিকিউরিটি গার্ডরা কিছুতেই তা কন্ট্রোলে আনতে পারছিলো না । হঠাৎ বসুনিয়া স্যার এসে এমন বিকট হুংকার ছাড়া শুরু করলেন যে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব ক্লীয়ার ।

আমার সেই আর্মি অফিসার বন্ধু সামরিক বাহিনীর আভ্যন্তরীন কার্যক্রমে এমন কমান্ডিং হুংকারের কালচারের সাথে পরিচিত, কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষকের এরকম কমান্ডিং অপারেশনাল এটিচিউড সে কল্পনাও করতে পারেনি ; সেটাই বলছিলেন সেই স্মৃতিচারণমূলক আড্ডায় ।

যতদূর মনে পড়ে, বসুনিয়া স্যার বুয়েটের বাহিরেও বিভিন্ন স্পোর্টস ক্লাব, গল্ফ ক্লাব, ইভেন্টের সাথে জড়িত ছিলেন ; জড়িত ছিলেন পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের অনেক প্রোজেক্টের স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার কিংবা কনসালট্যান্ট হিসেবে, এমনকি এখনো আছেন ।

এখনো কোন কোন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যখন শুনি তাদের স্ট্রাকচারাল কনসালটেন্ট ডঃ শামীমুজ্জামান বসুনিয়া, তখন ভাবতে ভালো লাগে এই বয়সেও স্যার একটিভ আছেন তাঁর প্রোফেশনে ; বলতে ভালো লাগে উনি আমাদের প্রিয় শিক্ষক ।

মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন বসুনিয়া স্যারকে আরও অনেক অনেকদিন সুস্হভাবে উনার প্রোফেশনে কমবেশি কাজ করার জন্য, আমাদের মত ছাত্রছাত্রীদের মাথার উপরে অভিভাবকের মত ছাতা হয়ে থাকার জন্য তৌফিক দান করেন ।

আনোয়ার পারভেজ শেফীন
চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ