Blog

২০১৬ সালের কথা । ফ্যামিলি নিয়ে আমেরিকা যাচ্ছিলাম ; মাঝপথে ৩ দিনের ইস্তাম্বুল ট্রিপ । আতাতুর্ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে সোজা চলে গেলাম বসফরাসের পাড়ে ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয়ান পার্টের এক রেডিসন-ব্লু হোটেলে (সুবিস্তৃত ইস্তাম্বুল শহরে অনেকগুলো রেডিসন হোটেল আছে) ।

হোটেলে চেক-ইন করে একটু রিফ্রেশমেন্টের পরে হাঁটতে হাঁটতে উঁচু-নীচু অলিগলির পথ পেয়ে চলে এলাম তাকসিম স্কয়ারের কাছে । সেখানে ম্যাকডোনাল্ডস্-এ কিছু খানা-পিনা করে হোটেলে ফেরত আসবো । তাকসিমের আশেপাশে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন দেখলাম, বেশ থমথমে অবস্হা । শুনলাম ক’দিন যাবৎ গে-দের বিভিন্ন দাবী-সম্বলিত বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করেছে সরকার । আর তাছাড়া সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো । তাই সরু গলিপথে সেখান থেকে হোটেলের দূরত্ব কম হলেও ফ্যামিলি নিয়ে সেই আলো-আঁধারি পথ দিয়ে ফেরত আসার সাহস পেলাম না ।

তাকসিম স্কয়ার থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করলাম । ট্যাক্সি ড্রাইভার ৩৪/৩৫ বছরের এক সুদর্শন যুবক । সে একটু ঘুরা পথে আমাদেরকে নিয়ে আসছিলো মনে হয় । আমাদের হোটেলের ঠিক উল্টাপাশে প্রধান রাস্তার অপর দিকে সে ট্যাক্সি থামিয়ে বললো যে, আমাদেরকে হোটেলের সামনে নামাতে হ’লে তাকে অনেক দূরে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে আসতে হবে । এখানে নামলে সে ডানদিকের রাস্তা দিয়ে তার পরবর্তী গন্তব্যে চলে যেতে পারে । এতে তারও সুবিধা, আবার মিটারে আমাদেরও বিলও কম উঠবে । ঘটনার আকষ্মিকতায় আমি তার ট্র্যাপ বুঝতে পারি নাই ।

এরপর সে আমাকে ভাড়া দিতে বললো । ভাড়া হয়তো হয়েছিলো ৩০/৩৫ টার্কিশ লিরা । আমি তাকে ৫০ লিরার নোট দিলে সে বলে যে, ওইটা ‘ফেক নোট’ (নকল টাকা) । এরপর তাকে ১০০ লিরার নোট দিলে সে ওইটাকেও ‘ফেক নোট’ বলতে থাকে । আসলে তার উদ্দেশ্য ছিলো যাতে আমি তাকে ১০০ ইউএস ডলারের কোন নোট দেই চেন্জ করার জন্য যার পরে সে প্রতারণার যাদু দেখাবে ।

তৎক্ষনাত আমার মনে পড়ে গেল, অনেকদিন আগে হুমায়ূন আহমেদের একটা ভ্রমন-কাহিনী ভিত্তিক উপন্যাস পড়েছিলাম (এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছি না) । হুমায়ুন আহমেদ শাওনকে নিয়ে এক সারপ্রাইজ ভিজিটে গিয়েছিলেন তুরস্কে । ইস্তাম্বুল শহরে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের এক প্রচলিত প্রতারনার গল্প তিনি তুলে ধরেছিলেন তাঁর সেই ভ্রমণকাহিনীতে ।

এই একই ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পড়েছিলেন তিনি । সেই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ১০০ ইউএস ডলার হুমায়ুন আহমেদ ট্যাক্সি-ড্রাইভারকে বের করে দিলে সে ওটাকে ১০০ টার্কিশ লিরা ধরে হিসেব করে চেন্জ দেয় । হুমায়ুন আহমেদ যখন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলেন যে, তিনি তাকে ১০০ ইউএস ডলার দিয়েছিলেন তখন ট্যাক্সি-ড্রাইভার তা অস্বীকার করে এবং তার ক্যাশবাক্স থেকে ১০০ টার্কিশ লিরা বের করে বলে যে, হুমায়ুন আহমেদ তাকে ওইটা দিয়েছেন এবং এই বলে নাটকীয়ভাবে চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দেয় যে, তার পুরো ট্যাক্সিতেই তখন কোন ১০০ ডলারের নোট নাই । ওরা বিশেষ রকমের বুদ্ধিমত্তার যাদুর খেলায় ওই নোটটি উধাও করে দেয় অর্থাৎ বিশেষ কোথাও লুকিয়ে ফেলে । সে যাত্রায় হুমায়ুন আহমেদ ও শাওন বোকা বনে যায় এবং ওই ১০০ ডলার গচ্চা দিয়েই ট্যাক্সি-ড্রাইভারের প্রতারনার ফাঁদে ধরা দিয়ে বিদায় নেয় ।

ওই গল্প হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়াতে আমি তাকে ১০০ ডলার দেই নাই । আমার বউ-বাচ্চাদেরকে পেছন থেকে নেমে যেতে বলি । আমি সামনে থেকে নেমে যাই । এরপর আমার দেয়া ১০০ টার্কিশ লিরা থেকে তার ভাড়া রেখে বাকীটা ফেরত দিতে বলি । সে বলে যে, আমি যে ১০০ লিরা তাকে দিয়েছিলাম তা নাকি সে আমাকে ফেরত দিয়ে দিয়েছে । এরপর সে আমার সাথে তর্ক করতে করতে ভীষণ এগ্রেসিভ ও ক্রেজি হয়ে উঠে এবং আমাকে ‘চীট’ বলে চিৎকার করে রাস্তার মাঝখানে সিনক্রিয়েট করতে থাকে । আমার বউ-বাচ্চারা নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ভয় পেয়ে ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায় ; কারন জায়গাটা ছিলো একটু ফাঁকা, আর সময়টা ছিলো সন্ধ্যা। আমি কোন রকমে তাড়াতাড়ি ওদেরকে নিয়ে ব্যস্ত প্রধান রাস্তা পাড় হয়ে আমাদের হোটেলের সামনে চলে আসি ।

তারপর হোটেলের রিসিপশনে ঘটনাটি জানালে ওরা আমাকে বোঝালো যে, হোটেলের লবির সামনে আমাদেরকে নামাতে আসলে সে হোটেলের সিকিউরিটি গার্ডের সামনে ওই প্রতারনার ফাঁদ পাততে পারতো না বলে রাস্তার অপর পাশে আমাদেরকে নামিয়ে ভাড়া মেটানোর নাটকীয় ফাঁদ তৈরী করে ।

তখন আমার মনে হলো, হুমায়ুন আহমেদ তাঁর জীবনের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে যে গল্প-উপন্যাস-ভ্রমনকাহিনীগুলো লিখে গিয়েছেন তা কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলো আমাদের প্রজন্মের বাংলাদেশী পাঠকদের অন্তরে । মনে হলো, প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ ওইদিন কানে কানে গল্পটা মনে করিয়ে দিয়ে ট্যাক্সি-ড্রাইভারের চুড়ান্ত ঠকবাজি খেলার আগেই আমাকে সাবধান করে দিলেন ।

ওপারে ভাল থাকবেন স্যার । বাংলাদেশের পাঠকদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন হাজার বছর ।

আনোয়ার পারভেজ শেফীন
চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ

বি.দ্র: আমার পোষ্টে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের ফটোটি ব্যবহার করেছি । এতে কেউ বিরক্ত হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবার অনুরোধ রইলো ।