Blog

২০১৫ সালে একবার আমি একা যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে ছিলাম ডাউনটাউনের সিটিহল থেকে কাছাকাছি একটা হোটেলে। আমি কোনো মেগাসিটিতে গেলে ডাউনটাউনে/সিটিসেন্টারে থাকার চেষ্টা করি যাতে McDonald’s, KFC, Burger King, Starbucks, Indian Restaurants, 7-Eleven, CVS Pharma অন্যান্য Super shop হাতের কাছাকাছি থাকে এবং ওয়াকিং ডিসট্যান্সে মেট্রো পাওয়া যায়, সন্ধ্যার পরে ঘরের মধ্যে আটকে না থেকে হাঁটাহাঁটি করা যায় আশপাশের আলো-ঝলমলে এলাকায়।

 

সেবার আমার বুয়েটের বন্ধু সোহেল একদিন বিকেলে তার অফিস থেকে এসে আমাকে সিটি হলের পাশ থেকে পিক করে সানফ্রান্সিসকো শহরের এদিক-সেদিক ঘুরে দেখিয়েছিল কোনো এক সন্ধ্যায়, এরপর একটি ইন্ডিয়ান/পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে বুয়েটের আরেক বন্ধু তমালের সাথে ডিনার শেষে আমরা গিয়েছিলাম একটি পাহাড়চূড়ায় যেখান থেকে পুরো সানফ্রান্সিসকো শহরের ভিউ দেখা যায়।

 

২০১৫ সালে আমি একা গেলেও এর পরেরবার ২০১৬ সালে সানফ্রান্সিসকোতে আবারও গিয়েছিলাম ফ্যামিলি নিয়ে। সেবারও উঠেছিলাম ডাউনটাউনে সিটি হলের কাছাকাছি আরেকটি হোটেলে। ফোনে এটা জানার পর বন্ধু সোহেল আমাকে বলল, আবারও ওই এলাকায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন দোস্ত? সে বলল, ওই এলাকার আশপাশের চিত্র দেখলে তো তোর ফ্যামিলির নেগেটিভ ধারণা হবে সানফ্রান্সিসকো শহরকে ঘিরে। আসলে সবাই চায়, যে শহরে সে থাকে সেই শহরে বেড়াতে এলে তার বন্ধু/স্বজনরা যেন পজিটিভ ধারণা নিয়ে ফেরে; তার ওপর আবার সিলিকনভ্যালি নামে খ্যাত ক্যালিফোর্নিয়ার বে-এরিয়ার মেগাসিটি বলে কথা।

 

বিষয়টি হলো, ডাউনটাউনের ওই এলাকার ফুটপাত আর ওপেন স্পেসগুলো সব হোমলেসদের দখলে। তারা অধিকাংশই বোধহয় নেশাগ্রস্ত, খুবই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত উৎকট তাদের পোশাক-আশাক, বেশভূষা ও আচার-আচরণ; কারণে-অকারণে চিৎকার করতে থাকে। সোহেলের ধারণা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে সানফ্রান্সিসকোতে এসে ৩/৪ দিন ওই এলাকায় থাকলে মানুষ বিশেষ করে বাচ্চারা মনে করবে যে, সানফ্রান্সিসকোর মানুষের জীবনযাপন বোধহয় এমনই।

 

সোহেলের আশংকা একেবারে অমূলক ছিল না। আমার স্ত্রী এবং বাচ্চারা রাস্তায় হাঁটার সময় খুবই ভীতসন্ত্রস্ত থাকত ওই হোমলেসদের উৎপাত দেখলেই। এমনও হতো যে, আমরা McDonald’s/KFC-তে গিয়ে খেতে বসেছি; আমাদের গা ঘেঁষে পাশের টেবিলে/চেয়ারে এসে বসল উন্মাদ স্বভাবের কোনো হোমলেস যার দীর্ঘদিন ধরে গোসল না করা শরীরের আর অনেকদিন ধরে পরিষ্কার না করা নোংরা পোশাকের দুর্গন্ধে পাশের টেবিলে বসে খাওয়াই দায়। দিনের পর দিন তারা গোসল করে না, কাপড়চোপড় পরিষ্কার করে না, আবার নেশাও করে, উল্টাপাল্টা বকে।

 

আমেরিকার অধিকাংশ উল্লেখযোগ্য মেগাসিটিতে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রায় অধিকাংশ মেগাসিটির ডাউনটাউনের কোনো কোনো এলাকায় হোমলেসদের ব্যাপক উৎপাত। বন্ধুদের কাছে শুনেছি, এরা সবাই নাকি অসচ্ছল নয়; অধিকাংশই না-কি সচ্ছল পরিবারের লোকজন যারা কেউ কেউ অ্যাডিক্টেড বা বিভিন্ন ক্রাইসিসে হতাশাগ্রস্ত, আবার অনেকেই না-কি ভং ধরে হোমলেস জীবনের ভাইবস/টেস্ট নেওয়ার জন্য এভাবে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকে। এমনকি কখনো কখনো সরকার বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে কোনো হোস্টেল/ডরমিটরিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হাইজেনিক পরিবেশে রেখে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও তারা না-কি কদিন থেকেই আবার চলে আসে রাস্তায় হোমলেস জীবনের স্বাদ উপভোগ করবার জন্য।

 

কী অদ্ভুত! কত কিসিমের, কত রং-চং-ঢং-ভংয়ের মানুষেরই না বিচরণ সৌরজগতের এই স্পেশাল গ্রহটিতে!