Blog

জীবনের প্রথম কোনদিন কীভাবে কোন গেট দিয়ে কার্জন হলে ঢুকেছিলাম তা মনে করতে পারছি না। এখন কেবল এইটা মনে করতে পারি যে, ক ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার আগেরদিন আমি আর আমার এক বন্ধু ফজলুল হক হলের একটি কক্ষে রাত্রিযাপনের জন্য উঠেছিলাম যে কক্ষে আমাদের একই অঞ্চলের এক বড় ভাই আর একজন মামা থাকতেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করলেও এইচএসসি পরীক্ষার পরে কোচিং সেন্টারে ভর্তি না হয়ে আমি উত্তরের জনপদে আমার বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম হাওয়া খেতে। তাই ঢাকা কলেজের হোস্টেল ছাড়ার পরে নতুন করে আর কোনো রেসিডেন্সিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়ে ওঠেনি আমার ওই মধ্যবর্তী দিনগুলোর জন্য।

 

যথারীতি ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট বের হলে সিরিয়ালের সাথে সামঞ্জস্য অনুযায়ী চয়েসের সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ার পালা। আমার প্রথম পছন্দ ফার্মেসি ডিপার্টমেন্ট হলেও সিরিয়াল অনুযায়ী প্রথমদিন বায়োকেমিস্ট্রিতে ভর্তি হতে হলো। এর কয়েকদিনের মধ্যেই মাইগ্রেট করে ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে স্থানান্তরিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাই, বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলেও আমি প্রথমদিন থেকেই বোধহয় ফার্মেসিতে ক্লাস শুরু করতে পেরেছিলাম।

 

এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না যে মোট কয়দিন সেখানে ক্লাস করবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার, তবে সম্ভবত সেই সময়কাল দুই বা তিন সপ্তাহ হতে পারে। সেই সময়টাতে আমি কিছুদিনের জন্য ফার্মগেটের কাছে পূর্ব-রাজাবাজারের একটি মেসে উঠেছিলাম থাকার জন্য। একদম সকালবেলা ফার্মগেট থেকে চলে যেতাম কার্জন হলে, তারপর ক্লাস আর আড্ডা শেষ হলে আবার সন্ধ্যাবেলায় ফিরতাম মেসে।

 

কার্জন হলের অল্প সময়ের ওই কয়েকটা দিন আমার স্মৃতিপটে আজও উজ্জ্বল। লাল-লাল সেই অ্যান্টিক টাইপের বিল্ডিং, সামনের দিকে বৃক্ষরাজিশোভিত খোলাপ্রান্তর যেখানে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য সবুজ ঘাসগুলো যেন অনেকটা কার্পেটের মতো! আরও আড্ডা দেওয়ার মতো জায়গা ছিল বিভিন্ন ভবনের সিঁড়ি আর করিডোর। যতটুকু মনে পড়ে কার্জন হলের শেষ প্রান্তের কোনায় আব্দুল গনি রোডের কাছাকাছি ছিল ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিংটা; তখনও ফার্মেসি আলাদা অনুষদ হয়ে সুইমিং পুলের উল্টোপাশে বর্তমানের নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়নি।

 

কার্জন হলের অবস্থানটা দারুণ লাগত! এক কোনার গেট দিয়ে বের হলে একদিকে দোয়েল চত্বর, তিন নেতার মাজার, বাংলা একাডেমি হয়ে টিএসসি; আরেকদিকে সুইমিং পুল হয়ে সামনে আগালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ আর শহিদ মিনার যে জায়গাটায় গেলেই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ে যেত। আরেক কোনার গেট দিয়ে বেরুলে একদিকে হাইকোর্ট, শিক্ষাভবন আর সোজা আব্দুল গনি রোড যেদিকে তাকালেই বুঝতাম এখান থেকেই মন্ত্রী-আমলারা পুরো বাংলাদেশের নাটাই ঘুরান; আর একটু আগালেই গুলিস্তান, জিপিও, ঢাকার জিরোপয়েন্ট যেখানে গেলে মনে হতো পুরো বাংলাদেশের মানুষ বোধহয় এখানেই একসাথে হামলে পড়েছে।

 

তবে ফজলুল হক হলের পাশের গেট দিয়ে বের হয়ে ডানদিকে কিছুদূর হাঁটলে সেই বঙ্গবাজারের ভাইবস্ এখনও মনে পড়ে; আর শহীদুল্লাহ্ হলের পাশের গেট দিয়ে বেরিয়ে বামের পথ ধরে আগালে চানখারপুলের ভেতরের দিকে নীরব হোটেলের সুস্বাদু সব ভর্তা-ভাজি আর হরেক পদের খাবারের কথা তো বাদই দিলাম; কদিন অন্তর-অন্তর সেখানে না গেলে তো বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপানের উদরপূর্তিই হতো না সেই জামানায় যদি পকেটে কিছু বাড়তি টাকা থাকত।

 

সম্ভবত অধিকাংশ সময়ই আমরা নাস্তা করতাম, লাঞ্চ করতাম শহীদুল্লাহ্ হলের পেছনের একটি ক্যান্টিনে। শহীদুল্লাহ্ হলের আশপাশের এলাকাসহ পুরো কার্জন হলের প্রতি আরেকটি কারণে টান অনুভব করতাম। কারণটি ছিল, ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করে বর্তমান জায়গায় আসার আগে এই কার্জন হল এলাকাতেই নাকি ছিল মধ্যবর্তী কোনো এক সময় ঢাকা কলেজের পূর্ববর্তী ক্যাম্পাস যা আমরা ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকেই শুনে আসছিলাম।

 

তবে যে কথাটি না বললেই নয়, সেটা হলো কার্জন হলে অ্যাকাডেমিক ডিপার্টমেন্টগুলোর পেছন দিকটাই ছিল বেশি আকর্ষণীয় যেখানে নয়নাভিরাম দিঘির একদিকে ফজলুল হক হল, আরেকদিকে শহীদুল্লাহ্ হল। দুই পাশেই হল আর দিঘির মাঝখান দিয়ে হাঁটার পথ; ওই পথটাও টানত খুব। আর হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো, দিঘির কাছাকাছি জুলোজি আর বোটানি ডিপার্টমেন্টকে কার্জন হলের দুষ্টু ছেলেরা লিপস্টিক ডিপার্টমেন্ট বলে ডাকত; কারণ, ওই ডিপার্টমেন্ট দুটিতে মেয়েদের সংখ্যাই ছিল বেশি।

 

একদিন ক্লাসের ফাঁকে দিঘির পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমার পাশের বন্ধু তার পূর্বপরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়াল, আমিও দাঁড়ালাম ক্ষণিকের জন্য। ঠিক তেমনি এক সময়, হ্যাঁ তেমনি এক সময় কিছু একটা ঘটে গেল; পার্থিব কিংবা অপার্থিব কিছু যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিছুক্ষণের জন্য আমার পৃথিবী স্থির হয়ে গিয়েছিল দিঘির পাড়ের কোনো এক কাজল চোখের গভীরতায়। মনের অজান্তেই হারিয়ে গিয়েছিলাম জীবনানন্দের কবিতায়, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য!’। পেছন থেকে কাঁধে হঠাৎ বন্ধুর হাত, ‘কি রে লাঞ্চ করতে যাবি না?’। আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। তবে ততক্ষণে চারদিকে তাকিয়ে পার্থিব জগতে আর কোনো কিছুরই উপস্থিতি খুঁজে পেলাম না! বড়ই আশ্চর্য!

 

এরপর বন্ধুর সাথে লাঞ্চ করতে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু রাজ্যের সব উথাল-পাথাল চিন্তা আর এলোমেলো ভাবনায় আমি তখন পাখা ছাড়াই কল্পনার হাওয়ায় ভাসছি। একই পথে ডিপার্টমেন্টের ক্লাসে ফিরে আসলেও দৃষ্টিসীমায় কোনো পার্থিব উপস্থিতি তখনও আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ভাবলাম কারও চোখে বিদ্যুৎ ঝলকানির মতো কল্পলোকের অপার্থিব স্বপ্নকন্যা হয়ে ধরা দিলেও পার্থিব এই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের কার্জন হলে তার আগমনও হয়তো আমারই মতো রষকষহীন কোনো এক বিষয়ে বিদ্যার্জনের জন্যই। নাকি কারও বন্ধু বা অতিথি হিসেবে ক্ষণিকের জন্য তিনি এসেছিলেন অন্য কোনো রাজ্যের স্বপ্নপুরী থেকে! সেদিন পরের ক্লাসগুলোতে স্যারের কোনো কথাই আর মাথায় ঢুকেনি। ক্লাস শেষে সন্ধ্যায় রাজাবাজারের মেসে ফিরলাম।

 

রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কতকিছুই না ভাবছি, হঠাৎ কী এমন হয়েছিল তখন? আমার কি দৃষ্টিভ্রম হয়েছিল? হ্যালুসিনেশন? আর বাস্তবেই যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি সম্বিত ফিরে পাওয়ার আগেই ক্ষণিকের মাঝে হাওয়ায় মিলিয়েই বা গেল কীভাবে!

 

পরদিন শুক্রবার বা কোনো ছুটির দিন ছিল বোধহয়। ভীষণ শরীর খারাপ লাগছিল, কোনো কিছু খাওয়ার রুচিও পাচ্ছিলাম না। মেসমেটরা বলল, বাড়িতে গিয়ে কদিন থেকে আসতে। চলে গেলাম নাটোরে আমার বাড়িতে। শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ডাক্তার দেখানো হলো পরদিন রাতে যিনি সাধারণ জ্বর বা অন্য কিছু ভেবে কয়েকটি ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন। তার পরদিন আমার মেজো মামা (ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা ডাক্তার) আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে আমার চোখ দেখেই বলে দিলেন জন্ডিস হয়েছে যার চিকিৎসা হলো বিশ্রাম নেওয়া আর বেশি বেশি পানি, শরবত এসব খাওয়া।

 

এভাবেই চলে গেল প্রায় এক মাস। এরই মধ্যে বুয়েট থেকে আমার ডাক পড়ল। সুস্থ হওয়ার পরে বুয়েটে এসে ভর্তি হলাম। কিন্তু সেশনজটে পড়া তখনকার বুয়েটের ট্রেইন্ড অনুযায়ী এক বছর পরে ক্লাস শুরু হবে, তাই আবার বাড়িতে চলে গেলাম ঢাকা শহর ছেড়ে বছর খানেকের জন্য।

 

কিন্তু সেই যে… সে-ই দিনের সেই তাড়া করে ফেরা স্মৃতি! কার্জন হলের কয়েকজন বন্ধুর সাথে আলাপ করেছিলাম। হ্যালুসিনেশন হলে ভিন্ন কথা; কিন্তু ক্ষণিকের জন্য অন্য কোনো জগতে আমার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যদি সত্যিই বাস্তবের কোনো ঘন কালো কাজল চোখের গভীরতায় ডুবে যাওয়ার জন্যই হয়ে থাকে তবে তাকে খুঁজেই বা পাব কীভাবে? কে সেদিন সেখানে কেন কীভাবে কোত্থেকে এসেছিল তার কোনো তথ্য বা ক্লু কিছুই তো নেই; না আছে জানা নাম, ডিপার্টমেন্ট কিংবা ব্যাচ। আর মানুষের চেহারা তো কারও কাছে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

 

মনে হচ্ছিল, ইস! আমার যদি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো অসাধারণ প্রতিভা থাকত, তাহলে না হয় কল্পনায় সেদিনের সেই স্মৃতি মনে করে মোনালিসার মতো একটা মুখাবয়ব দাঁড় করাতে পারতাম ক্যানভাসে; তারপর কার্জন হলের বন্ধুদের তা দেখাতে পারতাম খোঁজ পাওয়ার জন্য।

 

ছাত্রজীবনে যতবার বন্ধুদের সাথে আলাপ করেছি, ততবারই একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে। কেউ বলেছে হতে পারে বাস্তব কিছুতে অতি-অকস্মাৎ অতি অভিভূত হওয়ার তাৎক্ষণিক অনুভূতি, কেউ বলেছে হ্যালুসিনেশন, কেউ বলেছে কালো জাদুর মায়া।

 

তারপর যতবারই কার্জন হলে গেছি, দিঘির পাড়ের ওই জায়গাটায় গেলেই অন্য রকম এক অনুভূতি আমাকে তাড়া করেছে, ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ১৯৯৩ সালের বিশেষ দিনের বিশেষ মুহূর্তে যার স্থায়িত্ব হয়তো ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

 

মাঝে মাঝে মনে হতো, এখনও হয়, কোনোদিন কোথাও এই গোলাকার পৃথিবীর কোনো প্রান্তে, কোনো ক্ষণে হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে জীবনানন্দের বনলতা সেনের মতো করে কাজল চোখের কোনো জাগতিক কিংবা অতিপ্রাকৃত মানবী যদি পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’