Blog

প্রায়ই ফেসবুক বা লিংকডইনের অটো-এলগরিদমের বদৌলতে বিভিন্নজনের প্রোফাইল যখন সামনে আসে কিংবা কেউ যখন ফ্রেন্ড-রিকুয়েষ্ট পাঠায়, তখন চেক করতে গেলে উপরোক্ত বাক্যটি সামনে আসে এবং বুয়েটের লোগোটি আশেপাশে ভেসে উঠে যার মাধ্যমে ডিজিটাল প্লাটফর্ম আমাকে বোঝাতে চায় যে আমার এবং X এর আলমা ম্যাটার সেইম, আর তা হলো বুয়েট ।

 

কিন্তু কিছু বিষয় দেখে একটু খটকা লাগলে আরেকটু ভিতরে ঢুকে দেখি X বুয়েটে মাস্টার্স করেছে/করছে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আন্ডারগ্র্যাড শেষ করে যাদের মধ্যে কেউ ইন্জিনিয়ারিংয়ে, কেউ আবার ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি কিংবা ম্যাথামেটিক্সে মাস্টার্স করেছে/করছে বুয়েট থেকে ; বুয়েটে আন্ডারগ্র্যাড করা মেইনস্ট্রিম বুয়েটিয়ান না ।

 

এইটা তাও খানিকটা মেনে নেওয়া যায় । কিন্তু সম্ভবতঃ (আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই) বুয়েটের কোনো কোনো ডিপার্টমেন্ট বা কম্পিউটার সেন্টার ক’বছর আগে থেকে কয়েক সপ্তাহব্যাপী পরিচালিত সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে, হতে পারে তা সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পরিচালিত হয় কিংবা পরিচালিত হয় সান্ধ্যকালীন যারা যে কোনো রকমের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে বুয়েটে ওই কোর্সগুলো করতে পারে । তারাও প্রোফাইলে শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে বুয়েটের নাম লিখে রাখে যার কারনে অটোমেটিক্যালি সেখানে বুয়েটের লোগো যুক্ত হয়ে যায় ।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও আজকাল একই সমস্যা । ঢাবিতে মেইনস্ট্রিম আন্ডারগ্র্যাডের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক আলাদাভাবে পরিচালিত ইভেনিং মাস্টার্স বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্লাস হওয়া মাস্টার্স প্রোগ্রাম তাও নেওয়া যায় যখন তাদের প্রোফাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো যুক্ত করা থাকে ।

 

কিন্তু বিপত্তি বাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ এর ক্ষেত্রে । কয়েকবছর আগে থেকে সেখানে ৬ মাসের/৩ মাসের এমনকি ২ দিনের সার্টিফিকেট কোর্স চালু হয়েছে যেগুলো সম্পন্ন করে প্রশিক্ষণার্থীরা একটা সার্টিফিকেট পায় আইবিএ থেকে আর সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক ও লিংকড-ইন প্রোফাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইবিএ এর নাম ও লোগো লাগিয়ে দেয় ।

 

এটা কিন্তু এখন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয় । কয়েক বছর আগে যখন হার্ভার্ড বা কর্ণেল ইউনিভার্সিটি থেকে ইমেইল পেতাম সেখানকার ৩/৬ মাসব্যাপী বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তি হওয়ার আমন্ত্রণসহ, তখন আমি ভাবতাম এগুলি স্প্যাম মেইল, আমার মতো আড়াই দশক আগে লেখাপড়া শেষ করা অশিক্ষিত ব্যবসায়ী তথা হকারকে কোন দুঃখে হার্ভার্ড কিংবা কর্নেল ইউনিভার্সিটি তাদের ক্যাম্পাসে কোর্স করার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে যেচেপড়ে !

 

অনেকবার মেইল পাওয়ার পরে একবার ইনবক্সে থাকা মেইল ভালোমতো চেক করে দেখলাম যে, তারা এই অফারটি করছে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা টপ লেভেলের প্রফেশনালস যেমন চেয়ারম্যান/এমডি/ডিরেক্টর/সিইও/সিওও টাইপের লোকজনদের জন্য যেখানে এপ্লাই করার পূর্বশর্ত হিসেবে লেখা রয়েছে যে, এ্যাপ্লিকেন্টদের USA এর ভ্যালিড ভিসা থাকতে হবে ; কারন, ৩/৬ মাসের কোর্স হলেও বেশিরভাগ সময় হয়তো করতে হবে অনলাইনে, কিন্তু কোর্সের শেষ একমাস হয়তো USA তে গিয়ে ফিজিক্যালি অফলাইনে ক্লাস করতে হবে । আর সেই সাথে লাগবে হ্যান্ডসাম এমাউন্টের একটা কোর্স ফি, সে অনেক টাকা । তার মানে প্রফেশনাল এক্সপার্টাইজ ডেভেলপমেন্টের নামে দুনিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও টাকা কামানোর ধান্দা শুরু করেছে ।

 

সার্চ ইন্জিনের মাধ্যমে এবং স্যোশাল মিডিয়ার প্রোফাইল থেকে বোধহয় তারা বুঝতে পারে কাদের আমেরিকান ভ্যালিড ভিসা আছে আর কারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টপ লেভেলে কর্মরত আছে, কিংবা হয়তো রেনডমলি ইমেইল পাঠায় যেখানে যেইটা লাইগা যায় অর্থাৎ ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই যেখানে সিনক্রোনাইজ করে ।

 

একবার ভেবেছিলাম, বুয়েট থেকে পাস করার পর বাংলাদেশের একটা মিডলেভেলের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করে ক’বছর একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পরে বিগত প্রায় দুই দশক যাবৎ হকারি করে পেট চালাই, তাই অনেক জ্ঞানতাপস মানুষজন আমাকে অশিক্ষিত ভাবে । তাই হার্ভার্ড কিংবা কর্ণেল থেকে ৩/৬ মাসের একটা সার্টিফিকেট কোর্স করে এসে ফেসবুক, লিংকডইন প্রোফাইলে শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় হার্ভার্ড/কর্নেলের নাম আর লোগো যুক্ত করে দেই, পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ডেও লিখে রাখি, তাহলে সমাজের মানুষজন আমাকে আমেরিকান বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী উঁচু জাতের হোমো-সেপিয়েন্স ভাববে, একটু দরে উঠা যাবে । কিন্তু কোর্স ফি-টা একটু বেশি হওয়ায়, আর দেশের বিজনেস কার্যক্রম ছেড়ে অনেকদিনের জন্য আমেরিকা গেলে বিজনেস লাটে উঠতে পারে ভেবে আর আগাইনি ওই পথে । গরীবের সব সখ পূরণ হয় না ।

 

আজকাল বাংলাদেশে থাকা আশেপাশের নন-একাডেমিক সেক্টরে কাজ করা অনেকেই স্যোশাল মিডিয়ার প্লাটফর্মে তাদের প্রোফাইলে কিংবা ভিজিটিং কার্ডে হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, কর্ণেল কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা-ইউকে-অস্ট্রেলিয়ার অন্য কোনো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নাম, লোগো দিয়ে রাখে, ঠিক বুঝতে পারি না তারা সেখানে কতদিনের জন্য হিজরত করেছেন ।

 

বেশ ক’বছর আগে একদিন টেক্সাসের হিউস্টন থেকে আমি আর আম্রিকাপ্রবাসী আমার দুই বুয়েটিয়ান বন্ধু লংড্রাইভে যাচ্ছিলাম টেক্সাসের রাজধানী অস্টিনে আপ-ডাউন ডে-ট্রিপে । তাদের দু’জনের মধ্যে আমার একজন অত্যন্ত নাদুসনুদুস সুদর্শন বন্ধু আমেরিকাতে পিএইচডি করে একটি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিল তখন, এখন আমেরিকার ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি একাডেমির ডিরেক্টর যার কি-না ছোটবেলা থেকেই একটু বিজ্ঞানী-বিজ্ঞানী ভাব, আরেকজন ক্যালিফোর্নিয়ায় মাস্টার্স করে তারপর থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করে আম্রিকাতে একটা গ্লোবালি রেপুটেড কোম্পানিতে ।

 

গাড়িতে লং ড্রাইভে থাকার সময় আমি ওদের দুইজনকে বললাম, মামা, তোরা তো আম্রিকা আইসা বড় বিদ্বান হইছস, পৃথিবীর ১ নম্বর অর্থনীতি ও টেকনোলজির ক্ষমতাধর দেশের সিটিজেন তোরা ; কিন্তু আমি তো আর শিক্ষিত হইতে পারলাম না, মানুষজন দাম দেয় না, তাই তোগো লগে মাঝে মাঝে আইসা একটু দেখাসাক্ষাৎ কইরা যাই আর তোগো লগে ঘুরাফিরার সময় ছবি তুইলা ফেসবুকে পোস্টাই যাতে পাবলিক আমারে একটু পাত্তা দেয় এই ভাইবা যে, আমি নিজে বিদ্বান হইতে না পারি, তয় উন্নত বিশ্বের বিদ্বান লোকজনের লগে চলাফেরা করি ।

 

তারপর বললাম, আচ্ছা মামা, বাংলাদেশের অনেক লোক এই যেমন ধর বিশাল ভুড়িওয়ালা একজন ব্যবসায়ী (মিডিয়ামালিক) তার নামের আগে ‘ডঃ’ লাগিয়ে তার সুমধুর কন্ঠে গান শুনিয়ে পুরো বাংলাদেশের মানুষজনকে তাক লাগিয়ে দেয়, এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে আয়োজিত বড় বড় প্রোগ্রামের স্টেজ আলোকিত করে প্রধান/বিশেষ অতিথি হিসেবে সেখানে স্পন্সর করে আর তার সুললিত কন্ঠনিঃসৃত গান শুনিয়ে ; কিন্তু তার নামের আগে ‘ডঃ’ শব্দটা বারবার শুনতে শুনতে এমনভাবে মানবমনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে সবাই তার নাম বলার সময় অটোমেটিক্যালি ‘ডঃ’ দিয়ে শুরু করে যনো বাংলাদেশের সকল মানুষের মধ্যে তিনিই সবচাইতে বড় মাপের ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মহামানব । আল্লাহ মাবুদ তিনিই জানেন যে কোত্থেকে কোন বিষয়ে কবে পিএইচডি করেছেন অসাধারণ গায়কী গুণসম্পন্ন সেই জ্ঞানতাপস !

 

এমন আরও অনেকেই আছেন, তিনি একটু বেশি খ্যাতনামা হয়েছেন মিডিয়ামালিক হিসেবে এবং তার সুললিত কণ্ঠনিঃসৃত সঙ্গীত প্রতিভার জন্য, এই যা । যেমন, একজন প্রাক্তন অতি ক্ষমতাধর পুলিশের মহাপরিদর্শক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ইন্সটিটিউট থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন যিনি বোধহয় চাকরিতে ঢুকার আগে কোনো কলেজ থেকে আন্ডারগ্র্যাড সম্পন্ন করেছিলেন বলে শুনেছিলাম ।

 

দুষ্টুমি কইরা আম্রিকার ওই বন্ধুদেরকে বললাম, এমন একটা ‘ডঃ’ আমার নামের আগে লাগানোর শর্টকার্ট ব্যবস্হা কইরা দে তো ; মনে বড় শখ জাগে, পারবি ? বিজনেস একটিভিটিজের ব্যস্ততা সামলিয়ে আমি বাংলাদেশ থাইকা যতটুকু পারি কাজ করলাম, অনলাইনে কিছু একাডেমিক যোগাযোগ রক্ষা করলাম, বিষয় সংশ্লিষ্ট কিছু রিসার্চ করে প্রয়োজনীয় পেপার্স তৈরি করে অনলাইনে সাবমিট করলাম, আর দুই/একবার ফিজিক্যালি এসে প্রফসরের লগে দেখা-সাক্ষাৎ কইরা গেলাম, ফাইনালি একটা প্রেজেন্টেশন দিয়ে গেলাম । আছে এইরাম কোনো শর্টকাট ব্যবস্হা ? ওরা কইলো আছে, পরে কমুনে, এখন লম্বা রাস্তা গাড়ি চালাইতে চালাইতে, জার্নি করতে করতে টায়ার্ড লাগতেছে, তুই গাড়িতে চুপচাপ ঘুম যা । সেই যে ঘুম গেলাম, আর জাগা হইলো না ।

 

আজকাল বাংলাদেশে বসবাসকারী একাডেমিক লাইনের বাহিরে কাজ করা অনেক লোকের প্রোফাইল ইনফরমেশনে ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলোর বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের লোগো ও নাম যুক্ত থাকা দেখে একটু হিংসে হয় ; কথায় আছে না, ‘Man is by born jealous’ যেই শিরোনামে কয়েকদিন আগে আমি নিজেই একটা আর্টিকেল লিখে স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়েছিলাম ।

 

শেফীন  ।

 

পাদটীকা :

এটা স্যাটায়ার টাইপের একটা ফানপোস্ট, কেউ খুব সিরিয়াসলি নিবেন না প্লিজ ।