Blog

বুয়েটে ভর্তির পর থেকে অনুভব করতাম হলের ক্যান্টিনে, টিভিরুমে, গেষ্টরুমে, করিডোরে, আশেপাশের রুমেরুমে সর্বত্রই একটা গুনগুন আওয়াজ ইথারে ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে ; টোয়েফেল, জিআরই, আই-টুয়েন্টি, কে কবে ভিসা ফেইস করলো, কে পেলো, কে পেলো না, কার ফ্লাইট শিডিউল কবে – এইসব । আর পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন, কোন গন্তব্য অভিমুখী আওয়াজ ছি’লো এগুলো । বুয়েট ক্যাম্পাসে এমন একটা হাইপই ছিলো যে, বুয়েটে আন্ডারগ্র্যাড করার চূড়ান্ত লক্ষ্যই হ’লো ওইটা ।

 

আর যাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে না, তারাই কেবল মাটির টানে রয়ে যাবে সুজলা-সুফলা-শষ্য-শ্যামলা নদীমাতৃক বাংলাদেশে । কেউবা সরকারি চাকুরি করবে, কেউবা বেসরকারি ; তবে বিসিএস হাইপ তখনো সেভাবে উঠে নাই বুয়েটে । সে সময় হালজামানার নতুন আরেকটি হাইপ ছিলো মোবাইল অপারেটরগুলোর চাকুরি । কারন, মোবাইল কোম্পানিগুলো তখন বেশ হ্যান্ডসাম একটা স্যালারি অফার করতো কর্পোরেট এনভায়রনমেন্টের সাথে মডার্ন ফ্লেভারের আরও কিছু সুযোগ-সুবিধাসহ ।

 

আমেরিকার বিপরীতে আর একটা জনপ্রিয় হাইপ ছিলো সেসময় । আর তা হ’লো, দেশে যদি থাকতে চাও তবে কর্পোরেট এনভায়রনমেন্টে নিজের বিক্রয় মূল্য উঠাতে হ’লে ভর্তি হয়ে যাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ইন্সটিটিউটের এমবিএ প্রোগ্রামে । তখন আইবিএ এর এমবিএ -তে আসন ছিলো বোধহয় ৬০-টি । মাঝে মাঝে কোন কোনবার এমনও না-কি হয়েছে যে, ৬০-টি আসনের মধ্যে শুধু বুয়েট গ্র্যাজুয়েটই চান্স পেয়েছে ৪০/৪৫ জন । ভাবা যায়, হাইপ কোন লেভেলে ছিলো !

 

তখনো আমি জানতাম না যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঠিক কোন জায়গাটায় আইবিএ এর অবস্হান । তবে এটুকু কেবল শুনেছিলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইন্সটিটিউট হ’লেও সেখানকার এনভায়রনমেন্ট, পড়াশুনার পদ্ধতি না-কি সম্পূর্ন অন্যরকম, অনেকটা ওয়েস্টার্ন ধাঁচের যেখান থেকে এমবিএ করতে পারলে ঝাঁ-চকচকে কর্পোরেট অফিসের বড়বাবু হওয়া যায় ।

 

আইবিএ ইন্সটিটিউট চোখে না পড়লেও আইবিএ হোস্টেল চোখে পড়েছিলো অনেক আগেই । ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাত থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি, গ্রীনরোড হয়ে আনন্দ সিনেমা হল পর্যন্ত চলাচলকারী নিউমার্কেট-টু-ফার্মগেট ট্যাম্পুরুট ছিলো ঢাকা শহরের মধ্যে ট্যাম্পুর সবচাইতে জনপ্রিয় এবং হাই-ট্রাফিক রুট । তখন প্রায়ই গ্রীনরোডের গ্রীন সুপার মার্কেটের শুরুতেই আইবিএ হোস্টেলের সাইনবোর্ডটা চোখে পড়তো ।

 

আইবিএ হোস্টেল যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে, তাই আমি ভেবেছিলাম আইবিএ ইন্সটিটিউটও বোধহয় তেমনি এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে লুকিয়ে আছে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেখানকার ভাইবস্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাইবস্ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওয়েস্টার্ন ভাইবস্ ধারন করেছে ।

 

কিন্তু হায় ! প্রথম যেদিন মধুর ক্যান্টিন আর ডাকসু ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে দেখলাম ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ, ওইখানেতে বাস করে আইবিএ এর ছা ; তখন তো আমার চোখ চড়কগাছ ! কারন, যে মধুর ক্যান্টিন বাংলাদেশের ডান/বাম সকল ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা-নেত্রী, ঢাবিশাখার নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে আসা নেতা-নেত্রী-কর্মীদের আড্ডা-কলোরবে, মিছিলে-মিটিংয়ে, স্লোগানে-স্লোগানে সারাদিন মুখরিত থাকে, প্রয়োজনমাফিক যেখানে কখনো কখনো একটু-আধটু ঢিসুম-ঢিসুমও হয়, তারই ঠিক একেবারে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে-ই দিল্লিকালাড্ডু  !

 

কিভাবে সম্ভব ? তাহলে এতোদিন যা জেনে এসেছি তার সবই কি কেবলই মরীচিকা ? এইসব ভাবতে ভাবতে ক’দিন কেটে গেলো আমার । এরপর দিনে দিনে যা জানার তা জানলাম, যা ভাবার তা ভাবলাম ; তথ্য নিলাম কখন কিভাবে কোন পদ্ধতিতে আর নীতিমালায় আইবিএ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিভাবে কোন সিলেবাসে তা চলতো, প্রথম দিকে কারাই বা তা চালাতো । গঠনপ্রক্রিয়া, সিলেবাস প্রনয়ন আর প্রথমদিকের পরিচালনার কলকাঠির নাড়াচাড়ার গল্পটা অনেকটা EPUET (পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বুয়েটের আগের নাম) এবং EPUET এর অভ্যন্তরে গড়ে উঠে আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টির মতোই । এই বিষয়গুলি যারা জানেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন । যারা জানেন না, তাদের জন্য বলছি, সবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর পুঁজিবাদী পরাশক্তির জাদুকরী ক্যারিশমা যার আদরের কোমল পরশ আজও আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে শয়নেস্বপনে !

 

যা হোক, একটি কথা কিন্তু অস্বীকার করবার কোন জো নেই । আর তা হ’লো কয়েক দশক আগে বাংলাদেশের কর্পোরেট কালচারে আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের এলিট ও ক্যারিশম্যাটিক উপস্হিতির যে গল্পের বয়ান আমি দিলাম তা কিন্তু আজ অবধি কেউ বিট করতে পারেনি ; এখনো তা দোর্দণ্ড প্রতাপে চলমান ।

 

পাঠক হয়তো ভাবেছেন, নিশ্চয়ই লেখক আইবিএ থেকে এমবিএ করেছে ; তাই ইনিয়ে-বিনিয়ে আইবিএ এর ক্যারিশমার গল্প শোনানো হ’লো । না, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি । বুয়েট থেকে পাস করার ক’দিন আগে থেকেই একটি ইন্জিনিয়ারিং কোম্পানির সেলস্ এন্ড মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে সেলস টার্গেটকে চেজ করতে গিয়ে আমার শারীরিক ও মানসিক ভগ্নস্বাস্হ্যের এমনিতেই যে বেহাল দশা হয়েছিলো, তাতে ঢাবির আইবিএ থেকে এমবিএ করবার দুঃসাহস দেখাতে না পারলেও বছর দুই বাদে বিয়ে করবার সাহস দেখিয়েছিলাম, তার পরের বছরই প্রথম সন্তানের পিতা । এইটাও কি আইবিএ এর এমবিএ থেকে নিদারুণ কম কিছু ?

 

তবে হ্যাঁ, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে চাকুরি-বিয়ে-সংসার-

সন্তানের পাশাপাশি সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে আমার তখনকার বাসার কাছেপিঠের একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে বছর দুয়েক হালচষে এমবিএ একটা করে নিয়েছিলাম বটে ; তবে শুরুতেই ঢাবির আইবিএ থেকে এমবিএ না করতে পারার আক্ষেপটা আমার এখনো রয়ে গেছে । ‘আঙ্গুর ফল টক’ – এই ফিলোসোফিক্যাল অভিব্যক্তি প্রকাশে আমি বিশ্বাসী নই সেই ছেলেবেলা থেকেই । ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যা করা হয়ে ওঠেনি সেকথা বলতে দ্বিধাবোধ করি না কখনো ; অস্বীকার করতেই বরং দ্বিধা লাগে । কতোকিছুই তো চেয়েও পাইনি, আবার কতোকিছুই তো পেয়েও হারিয়েছি !

 

শেষ করছি নিজের আসল স্ট্যাটাস জানিয়ে । আমি ছিলাম তখনকার দিনে মানে নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধে বুয়েট কালচারে বেড়ে উঠা ছাগলের ৪ নম্বর বাচ্চা । গড়পড়তা চিন্তাধারা থেকে সেসময় ধরে নেওয়া হতো যে, ছাগলের ১ নম্বর বাচ্চারা যায় আমেরিকা, ছাগলের ২ নম্বর বাচ্চারা ঢাবির আইবিএ তে এমবিএ করে কিংবা গ্লোবালি রেপুটেড হাতেগোনা কয়েকটি এমএনসি-তে অথবা সদ্য গজিয়ে উঠা ঝাঁ-চকচকে টেলিকম ইন্ডাস্ট্রিতে চাকুরি করে, ছাগলের ৩ নম্বর বাচ্চারা সরকারি চাকুরি করে ; আর ছাগলের ৪ নম্বর বাচ্চারা তখন বুয়েট থেকে বেরিয়েই লোকাল কোম্পানিতে যে যেখানে যে কাজ পায়, তাই শুরু করে দেয় বাছবিচার না করেই পেট চালানোর ধান্দায় ।

 

আর শুরুতেই বিজনেস ? সে আর বলতে ! চারিদিকের আত্নীয়স্বজন, পরিচিত মানুষজন এমন লুক দিতো যার অর্থ দাঁড়াতো এমন, “সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি ? ” । আরও সোজা ভাষায় বললে, “এই যদি ছিলো তোর মনে তবে নিজ এলাকার যে গঞ্জ থেকে বিদ্বান হ’তে ঢাকায় আসলি, ব্যবসাই যখন করবি তখন ওই গঞ্জই বা খারাপ ছিলো কোন দিক দিয়ে রে পাগলা ? হাঁস-মুরগির খামার, গরু মোটাতাজাকরন কিংবা আলুপটলের কারবারটা তো আরও ৭-৮ বছর আগেই শুরু করতে পারতি সেই ফেলে আসা গঞ্জ থেকেই ; এতো দিনে বরকত হ’তো, ঘরে বউ-বাচ্চা থাকতো, এই বয়সে শূন্য হাতে দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে হতো না রে চান্দু ” । এইজন্য ছাগলের ৪ নম্বর বাচ্চার মধ্যেই আমি তাদের প্রকারভেদের ক্রমিক নম্বর সীমাবদ্ধ রেখেছি, সেল্ফ এন্ট্রিপ্রিনিয়রশীপকে অন্তর্ভুক্ত করে  ক্রমিক নম্বরকে আর বাড়াতে চাইনি ।

 

তবে ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস !  জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে আমাকে শেষ পর্যন্ত ব্যবসাতেই নামতে হ’লো ; তাই ছাগলের ৫ নম্বর বাচ্চার অস্তিত্ব আর ঢেকে রাখবার জো রইলো কই  ?

 

শেফীন

 

পুনশ্চঃ

ছাগলের বাচ্চা শব্দটি ব্যবহার করেছি রসিকতা করে । কেউ আবার তা সিরিয়াসলি নিয়ে আমার মুন্ডুপাত কইরেন না প্লিজ ।