Blog

Episode 6:

 

‘বাকী চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’- এই কথাটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক দোকানে লেখা থাকে । এমনি-এমনি কি দোকানদাররা এটা লিখে রাখে ?  মোটেই না । বরং বাকি দিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করে তারপর একসময় সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, বিক্রি-বাট্টা যা হয় হোক, কিন্তু বাকি আর দিব না ।

 

আপনি যখন নতুন নতুন ব্যবসায় নামবেন, তখন আপনার অনেক ক্রেতা আপনাকে বলবে, নতুন মার্কেটে এসেছেন, আপনার প্রোডাক্টের কুয়ালিটি কেমন তা তো আগে যাচাই করতে হবে যেহেতু এখনো আপনার স্ট্রং রেফারেন্স, গুডউইল গড়ে উঠে নাই । এসব বলে আপনার মনোবল আগে ভেঙে দিবে । এরপর আপনার সাথে দামাদামি করে আপনার প্রোডাক্টের প্রাইস এমন পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রস্তাব করবে যাতে প্রফিট তো দূরের কথা, আপনি ওভারহেড এক্সপেন্সেসও তুলতে পারবেন না । আপনাকে বলবে, আরে ভাই, ব্যবসায় নেমে প্রথমেই লাভ করতে চাইলে হবে ? প্রথমে লস দিয়ে হলেও মার্কেটে ঢুকতে হবে, রেফারেন্স ক্রিয়েট করতে হবে ; এটাই ইন্টেলিজেন্ট বিজেনস স্ট্র্যাটেজি । মার্কেটে একবার মানুষ আপনাকে চিনে গেলে এরপর আপনি বাজিমাৎ করবেন ; তখন ধুমায়ে প্রফিট করবেন । ব্যস, আপনিও চিন্তা করে দেখলেন, কথা তো খারাপ বলে নাই ; আপনি রাজি হয়ে গেলেন ।

 

এরপর আসবে পেমেন্ট টার্মসের আলাপ । তারা আপনাকে বলবে যে, ‘আমরা তো কোন এডভান্স দেই না ; আর তাছাড়া আপনি তো একেবারেই নতুন, তাই কোন বিশ্বাসে আপনাকে এডভান্স দিবো ? ‘ । আপনি বাকি দিতে রাজি না হলে তারা বলবে, ‘আপনার চাইতে অনেক বড় ও রেপুটেড কোম্পানি আমাদেরকে বাকিতে প্রোডাক্ট সাপ্লাই দেওয়ার জন্য আমাদের পেছনে কন্টিনিউয়াসলি ঘুরছে, কারন তারা আমাদের রেপুটেশন ও কমিটমেন্ট সম্পর্কে জানে ; তারা জানে যে, বন্দুকের গুলি মিস হয়, কিন্তু আমাদের জবান মিস হয় না ‘ । এইরকম বিভিন্ন ধরনের নাটকীয় সংলাপ দিয়ে আপনার উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করে বাকিতে প্রোডাক্ট সাপ্লাই করার জন্য আপনাকে মোটিভেট করে ফলবে ।

 

এরপর যখন বাকিতে প্রোডাক্ট সাপ্লাই  দিয়ে ফেলবেন, তারপর বুঝবেন কত ধানে কত চাল । পেমেন্ট চাইতে গেলে আজ একথা তো কাল আরেক কথা । কখনো ফান্ড ক্রাইসিস, কখনো ব্যাংকিং সমস্যা আরও কত কি ! এই চান্দ পার হইলে ঐ চান্দে দিব, রোযার ঈদ পার হইলে কুরবানির ঈদে দিব ইত্যাদি ইত্যাদি ……  । ঈদের আগে অপেক্ষা করাতে করাতে বলবে চানরাইতে দিব । চানরাইত পর্যন্ত তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে বসে থাকলে শেষ মুহূর্তে গিয়ে পাওনা ১০০ টাকার মধ্যে ১০ টাকা দিয়ে বিদায় করবে । আপনি চিল্লাচিল্লি করলে বলবে, অনেক কষ্টে আপনার জন্য এইটুকু ম্যানেজ করেছি, এই দিয়ে আপাততঃ চালিয়ে নেন, ঈদের পরে দেখি কী করা যায় ! ঈদের পরের দেড়-দুই মাস তো ভ্যাকেশনের স্হিতিজড়তা কাটাতে এমনিতেই চলে যায় চোখের পলকে ।

 

এরপর তারা মাঝে মাঝে আপনার সরবরাহকৃত প্রোডাক্টের বিভিন্ন খুত ধরা শুরু করবে যার মূল উদ্দেশ্য আপনার পেমেন্ট দীর্ঘদিন আটকে রাখা এবং আপনার গলার সুর নরম রাখা । কারো কারো আবার অডিট ডিপার্টমেন্ট আছে । তারা কথায় কথায় একটা বুলি ছাড়ে, আর তা হলো, আপনার বিল অডিটে আটকে আছে, অডিট ডিপার্টমেন্ট কিছু ফাইন্ডিংস পেয়েছে যেগুলো সল্ভ হওয়ার আগ পর্যন্ত একাউন্টস ডিপার্টমেন্ট বিল দিতে পারছে না ।

 

বুঝলেন তো তাহলে ? বাকির নাম ফাঁকি । শুধুমাত্র বাকির ফাঁদে পড়েই বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তাদের একটা বড় অংশ সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে যায়, আর উঠে দাঁড়াতে পারে না । কথায় বলে, ‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা, নহে ধন হলে প্রয়োজন’।

 

এখন প্রশ্ন হ’লো, কতটুকু বাকি দেওয়া যায় আর পেমেন্ট টার্মস নির্ধারনে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা যায় ?

 

এই বিষয়ে পরের এপিসোডে বলব । আজ এপর্যন্তই ।

 

চলবে …..

 

আনোয়ার পারভেজ শেফীন

চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ

 

পাদটীকা:

আমার লেখা কথাগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত যা আমার নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং আমার আশেপাশের মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া । এর ব্যতিক্রমধর্মী বা সম্পূর্ন বিপরীতধর্মী অভিজ্ঞতা অনেকের থাকতে পারে । আর তাছাড়া পরিবেশ, পরিস্হিতি, ভাগ্য, অঞ্চলভেদে ব্যবসার ধরন, খুঁটির জোর ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামকের ভিন্নধর্মী প্রভাবে একেকজনের অভিজ্ঞতা একেক রকম হতেই পারে ; তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই ।

 

#Entrepreneurshup_উদ্যোক্তা_উদ্যোগ_New_Business_Bangladesh_Anwar_Pervez_Shefin_Powerbreeze