Blog

Episode 7:

 

পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন,

নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন ।

 

আমার আগের এপিসোডগুলিতে আমি মূলত: নতুন উদ্যোক্তাদের সামনে সাধারণভাবে যে চ্যালেন্জগুলো আসে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমার খুব কাছে থেকে দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে । কেউ কেউ আমাকে বলেছেন যে, চ্যালেন্জগুলি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেই বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করতে । আজকে কিছুটা সেই দিকে ফোকাস করবো ।

 

সর্বশেষ ৬ নং এপিসোডে আমি লিখেছিলাম, বাকিতে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার পরে পাওনা টাকা উদ্ধার করতে না পেরে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তাদের একটা বড় অংশ অংকুরেই ঝরে পড়ে । এক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা যায় সেই বিষয়ে আজকে আলোচনা করব ।

 

প্রথমত: আপনার লক্ষ্য থাকতে হবে যতটা সম্ভব চেষ্টা করা যাতে বাকিতে আপনার প্রোডাক্ট বা সার্ভিস বিক্রি করতে না হয় । সেক্ষেত্রে নেগোসিয়েশনের সময় আপনি বলবেন যে, আপনাকে ৪০-৫০ % দিতে হবে ওয়ার্ক অর্ডারের সাথে এডভান্স হিসেবে ; প্রোডাক্ট তৈরি করার পরে বাকি টাকা ক্রেতা পরিশোধ করলে আপনি প্রোডাক্ট ডেলিভারি করবেন । আর সার্ভিস বা ইন্সটলেশনের ক্ষেত্রে বলবেন, প্রথমে কিছুটা এডভান্স দিতে হবে, এরপর কোনো জিনিস যদি সরবরাহ করতে হয় তবে সেই টাকা ডেলিভারির পূর্বে দিতে হবে ; আর বাকি টাকা ইন্সটলেশনের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রগ্রেস বিল হিসেবে দিতে হবে । কাজের বাস্তব অগ্রগতি আর প্রগ্রেস বিল আদায়ে আপনাকে কিছুটা কৌশলী হতে হবে যাতে আপনি ব্যাকফুটে না পড়েন, অর্থাৎ এমন যেন না হয় যে আপনার পাওয়া পেমেন্টের তুলনায় আপনি অনেক বেশি কাজ করে ব্যালান্স অফ পাওয়ারে পিছিয়ে পড়েন । তাহলে কিন্তু ইঁদুর-বিড়াল খেলায় আপনি পিছিয়ে পড়বেন যার ধারাবাহিকতায় আপনার পেমেন্টপ্রাপ্তি আস্তে আস্তে রিস্কি হয়ে উঠতে পারে ।

 

তবে রেপুটেড মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো কিন্তু উপরোক্ত শর্তে আপনাকে কাজ দিবে না । তারা কেউ কেউ একেবারেই এ্যাডভান্স দেয় না, আর কেউ কেউ কিছুটা এ্যাডভান্স দিলেও পরবর্তীতে কাজ শেষ করে ফাইনাল বিল সাবমিট করতে বলে । সেক্ষেত্রে তাদের পেমেন্ট প্রদানের গুডউইলের বিষয়ে মার্কেটে ভালো রেপুটেশন থাকলে আর সেই কাজ উঠানোর জন্য আপনার পর্যাপ্ত পরিমাণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল থাকলে আপনি রিস্ক নিতে পারেন । তবে সেক্ষেত্রে প্রপার ডকুমেন্টেশন থাকতে হবে এবং যখন যা দিচ্ছেন বা করছেন তার ডেলিভারি চালানে বা ওয়ার্ক প্রগ্রেস রিপোর্টে কাস্টমারের স্বাক্ষর নিয়ে রাখবেন এবং বিষয়গুলো কাস্টমারকে ইমেইল করে রিপ্লাই-ইমেইলে তার এ্যাকনলেজমেন্ট নিয়ে তা সংরক্ষণ করবেন । কাজ শেষ হলে কাস্টমার এন্ডের প্রোজেক্ট ম্যানেজারের কাছ থেকে যত দ্রুত সম্ভব ওয়ার্ক কমপ্লেশন সার্টিফিকেট নিয়ে ফরমালি বিল সাবমিট করে রিসিভেবল পাওয়ার জন্য ফলোআপ মেইল দিতে হবে, লেগে থাকতে হবে কখনো টেলিফোন কলে, কখনো ফিজিক্যাল প্রেজেন্সের মাধ্যমে ।

 

ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির পাশাপাশি কিছু লোকাল গুড পেমেন্ট মাস্টার আছে পেমেন্ট প্রদানে যাদের সততার গল্প মার্কেটে চাউর আছে । তাদের সাথেও আপনি কিছু এডভান্স, কিছু প্রগ্রেস বিল আর কিছু স্বল্পদিনের ক্রেডিটে কাজ করতে পারেন । তবে মনে রাখবেন, যত ভাল পেমেন্ট মাস্টারই হোক না কেন, আপনাকে একটা লেভেল পর্যন্ত সাবধানতা ও যথাযথ ফলোআপ মেইনটেইন করতেই হবে ; ঘরে এসে কেউ আপনার পাওনা টাকা পৌঁছে দিয়ে যাবে না ।

 

পেমেন্ট মাস্টার হিসেবে মার্কেটে যেসকল কোম্পানির গুডউইল নাই বরং উল্টোটা আছে, তাদের সাথে কোনোভাবেই ক্রেডিটে কোনো কাজ করবেন না ; করলে জীবন বরবাদ হয়ে যাবে ।

 

যদি পেমেন্ট মাস্টার হিসেবে মাঝামাঝি লেভেলের গুডউইল আছে এমন কোনো কোম্পানির সাথে কাজ করতে চান তাহলে কয়েকটি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। প্রথমতঃ সকল টেকনিক্যাল ও কমার্শিয়াল টার্মস্ এন্ড কন্ডিশনস্ সুস্পষ্টভাবে লিখে তাদের লেটারহেড প্যাডে পারচেজ অর্ডার নিবেন, পাশাপাশি তিনশত টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ডীড-অফ-এগ্রিমেন্ট করবেন । যে পরিমান টাকা বাকি রেখে প্রোডাক্ট ডেলিভারি দিবেন বা কাজ সম্পন্ন করবেন, আগেই সেই পরিমান টাকার একটি পোস্টডেটেড চেক নিয়ে নিবেন যাতে যদি তারা যথাসময়ে বাকি পেমেন্ট না দেয় তাহলে যেন আপনি কোর্টে চেক প্রতারণার মামলা ঠুকে দিয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন । মনে রাখবেন, চেকের বিপরীতে চেক প্রতারণার মামলা ছাড়া পারচেজ অর্ডার বা ডীড-অফ-এগ্রিমেন্টের উপর ভিত্তি করে মামলা করলে খুব একটা সুবিধা পাওয়া যায় না ।

 

মোটেও মনে করবেন না যে, চেক নেওয়া থাকলেই আপনি খুব সহজেই টাকা পেয়ে যাবেন যদি আপনার গ্রাহক তা সহজে দিতে না চায় । চেকের পাশাপাশি যথাযথ পারচেজ অর্ডার বা ডীড থাকতে হবে কাজের প্রমাণ হিসেবে । কয়েক বছর আগে হাইকোর্ট থেকে রুল এসেছে যে, কোনো চেক প্রতারণার মামলা করতে হলে চেকের পাশাপাশি বাদি কোন গ্রাউন্ডে বিবাদির কাছ থেকে টাকা পাবে তার বিশ্বাসযোগ্য ডকুমেন্ট লাগবে ।

 

আর একটি কথা, মামলা কিন্তু করতে হবে চেকের সিগনেটরির এগেইনেষ্টে । তাই, চেক নেওয়ার সময় দেখে/বুঝে নিবেন, সেটা কার স্বাক্ষর করা । তার এনআইডি সংগ্রহে রাখতে হবে চেকের পাশাপাশি । কিংবা ডীড-অফ-এগ্রিমেন্ট এর মধ্যে চেকে স্বাক্ষরদাতা ব্যক্তির জেনুইন পুরো নাম, এনআইডি নম্বর, পিতার নাম, বর্তমান ঠিকানা, স্হায়ী ঠিকানা লিখা থাকতে হবে । কারন, কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে এই তথ্যগুলি লাগবে ।

 

মনে রাখবেন, মামলা করলেই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাবেন না । এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া । যদি বিবাদী ঘাঘু এবং দুষ্ট হয় তাহলে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত ফাইট দিয়ে আইনের বিভিন্ন রকম ফাঁকফোকর দিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার মাধ্যমে আপনার পাওনা টাকাকে পয়সা বানিয়ে ফেলতে পারে তার আইনজীবীর মাধ্যমে বছরের পর বছর মামলা ফেইস করে । তবে চেক নিয়ে রাখার সুবিধা হলো, ক্রেতা আপনার পাওনা টাকা সহজেই মেরে দেবার পরিকল্পনা করতে পারবেনা এটা চিন্তা করে যে, আপনি আইনের আশ্রয় নিলে তাকে হ্যাসেল পোহাতে হবে এবং বিভিন্ন রকম টালবাহানা করে আপনাকে লম্বা সময় দেরি করাতে পারলেও কোনো না কোনোদিন আপনার পাওনা টাকা আপনাকে তার পরিশোধ করতেই হবে ; আজ, কাল অথবা পরশু যদি আপনি মামলা-মোকদ্দমায় ধৈর্য সহকারে লেগে থাকতে পারেন।

 

আর হ্যাঁ, চেক প্রতারণার মামলা করতে গেলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী কী নিয়মকানুন ও ধাপ বা পর্যায় আছে তা অনুগ্রহপূর্বক একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর কাছ থেকে শুনে নিবেন । আমি আংশিক জানলেও এখানে তা লিখতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, আর লেখাটিও অনেক বেশি লম্বা হয়ে যাবে ।

 

চলবে …..

 

আনোয়ার পারভেজ শেফীন

চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ

 

পাদটীকা:

আমার লেখা কথাগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত যা আমার নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং আমার আশেপাশের মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া । এর ব্যতিক্রমধর্মী বা সম্পূর্ন বিপরীতধর্মী অভিজ্ঞতা অনেকের থাকতে পারে । আর তাছাড়া পরিবেশ, পরিস্হিতি, ভাগ্য, অঞ্চলভেদে ব্যবসার ধরন, খুঁটির জোর ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামকের ভিন্নধর্মী প্রভাবে একেকজনের অভিজ্ঞতা একেক রকম হতেই পারে ; তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই ।

 

#Entrepreneurshup_উদ্যোক্তা_উদ্যোগ_New_Business_Bangladesh_Anwar_Pervez_Shefin_Powerbreeze